জীবনে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র চাবি হলো সাহস। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহসী হওয়ার বিকল্প নেই৷ সাহসীরা ব্যর্থ হয় না।

ক্যারিয়ারে ১৪টি লাল কার্ড পেয়েছি!- জিনেদিন জিদান ৯৯৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের মার্সেইতে ১৯৭২ সালের ২৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন৷ জিদান ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার সম্মাননা লাভ করেছেন তিনবার, একবার ব্যালন ডি’অর৷ ২০০৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপে তাঁর অনবদ্য নৈপুণ্যে ফ্রান্স ফাইনালে ওঠে, জিদান লাভ করেন গোল্ডেন বল। আমার বাবার কাছ থেকেই আমি সবকিছু শিখেছি। তাঁর কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, অন্যকে সম্মান দেওয়া। আমার বাবা আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সে আসেন, যা ছিল তাঁর জন্য দুঃস্বপ্ন। নতুন জায়গায় কাজের সন্ধান ও ফ্রান্সের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর জন্য বেশ কঠিন৷ নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বাবাকে সব সময় সংগ্রামের মধ্যে থাকতে হতো। বাবা সেই কষ্টের গল্প থেকে আমাকে অনন্য একটা কথা শিখিয়েছিলেন। অন্যদের সম্মান অর্জনের জন্য আপনাকে সব সময় দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। সম্মান আদায় করতে চাইলে অন্যদের সম্মান দিতে হবে। আমার বাবার এই শিক্ষা আমি আমার সন্তানদের দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলায় আমার মনে হতো, আমি নিয়ম-শৃঙ্খলার জালে বন্দী। আমার শৈশব ছিল বেশ কঠিন, সবকিছু নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। কিন্তু এখন টের পাই, সেই কঠিন শৈশবের কারণেই আমি এখন জীবনের বড় বড় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি খুব সহজে। বাবা আমার জন্য ছিলেন বাতিঘর। সেই বাতির আলো থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার পুরো ক্যারিয়ারে প্রয়োগের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। যেকোনো পরিবারের জন্য বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি বড় ধরনের একটা সুবিধাও বটে। যেসব শিশুর বাবা-মা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, সে শিশুরা ব্যতিক্রম হয়। তারা অন্যদের চেয়ে বেশি উদার হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ছোঁয়ায় তারা অনন্য হয়। আমার সন্তানদের দিকে তাকালে এটা সবাই বুঝতে পারবে। আমি ছোটবেলায় রাস্তায় ফুটবল খেলতাম; যেখানে আমি খেলতাম সেরাদের সেরার মতো, আমার নিজের মতো। বল নিয়ে সেই দুরন্ত কৈশোর ছিল আমার জন্য স্মরণীয় এক সময়। তখনো আমি জানতাম না, ফুটবল খেলা খুবই মজার একটি কাজ। জীবনে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র চাবি হলো সাহস। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহসী হওয়ার বিকল্প নেই৷ সাহসীরা ব্যর্থ হয় না। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নতুন করে পথ খুঁজে নেয়। মানুষের জীবন অনেকটা বরফে চলা স্লেজ গাড়ির মতো—সব সময় দৌড়ের ওপর থাকে। কখনো কখনো পথ চলতে মনে হবে, আরে, কষ্ট ছাড়াই তো পর্বতের ঢাল বেয়ে নেমে সামনে যাওয়া যায়! কিন্তু সামনে যখন পর্বতের খাড়া অংশ হাজির হবে, তখন সেটা পার হতে আপনার সাহসই হবে আপনার একমাত্র সহায়, একমাত্র উপায়। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তার সাহস। আমার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ১৪টি লাল কার্ডের দেখা পাই, যার মধ্যে ১২টির একমাত্র কারণ ছিল রাগ। আমাকে যখন অন্যরা কথার মাধ্যমে রাগিয়ে তুলতে পেরেছে, তখনই আমি লাল কার্ডের দেখা পাই। এটা নিঃসন্দেহে গর্বের কোনো কারণ নয়। আমি আমার পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না। আমার অন্যায় সহ্য করার ক্ষমতা কম, তাই আমি রেগে গিয়ে লাল কার্ড দেখার কাজ করতাম। যদিও আমি মাঠের বাইরের উল্টো। সাধারণ জীবনে আমি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করি। আমি কাউকে কখনোই রাগানোর চেষ্টা করি না। কখনোই কারও সঙ্গে প্রতারণা করি না। সারা জীবন এই সাধনা করে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমি যখন নিজে বাবা হই, সেটা ছিল অন্য রকম অভিজ্ঞতা। আমি বড় আঙ্গিকে জীবনকে দেখার সুযোগ পাই। বাবা হওয়া মানেই সন্তানকে পড়াশোনা করার দায়িত্ব নয়। আপনি যা জানেন, জীবন সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছেন, তা আপনার সন্তানকে জানানো আপনার কর্তব্য। আমার জন্য ফুটবল খেলার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের সময় দেওয়া ছিল বেশ কষ্টকর। কোনোটাই আপনি ছাড়তে পারবেন না। কি ফুটবল, কি সন্তান—দুটোই যে জীবন। জীবনকে উপভোগ করতে চাইলে আপনার অতীতের বেশ কিছু ঘটনা ভুলে যেতে হবে। সেই ঘটনাগুলোয় আপনি হয়তো ছিলেন অন্যদের মতন; নিজেকে নিয়েই ছিল আপনার সব ব্যস্ততা আর সব ধান্দা। আপনার সব শক্তি অন্য সব সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করার মহান দীক্ষা নিতে হবে। সেই দীক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে না পারলেও চেষ্টা করতে দোষ কী? সেই চেষ্টাটা সব সময়ই জাদুর মতোই অবিশ্বাস্য হয়। যতক্ষণ নিজেকে মানুষের ভালো করার জন্য বদলাতে পারবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই চেষ্টা মনে হবে অলৌকিক কোনো গল্প। সূত্র: ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের এস্কোয়ার ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান বেড়ে ওঠার দিনগুলো শুনলাম, আমি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরোপুরি বাঁদর হয়ে গেছি। আমার বাঁদরজীবনের সমাপ্তি ঘটানোর জন্যই আমাকে নাকি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে। আমার প্রথম স্কুলে যাওয়া উপলক্ষে একটা নতুন খাকি প্যান্ট কিনে দেওয়া হলো। সেই প্যান্টের কোনো জিপার নেই। সারাক্ষণ হা হয়ে থাকে। অবশ্যি তা নিয়ে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না। নতুন প্যান্ট পরছি—এই আনন্দেই আমি আত্মহারা। মেজো চাচা আমাকে কিশোরীমোহন পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন এবং হেড মাস্টার সাহেবকে বললেন, চোখে চোখে রাখতে হবে। বড়ই দুষ্ট। আমি অতি সুবোধ বালকের মতো ক্লাসে গিয়ে বসলাম। মেঝেতে পাটি পাতা। সেই পাটির ওপর বসে পড়াশোনা। ছেলেমেয়ে সবাই পড়ে। মেয়েরা বসে প্রথম দিকে, তাদের পেছনে ছেলেরা। আমি খানিকক্ষণ বিচার-বিবেচনা করে সবচেয়ে রূপবতী বালিকার পাশে ঠেলেঠুলে জায়গা করে বসে পড়লাম। রূপবতী বালিকা অত্যন্ত হৃদয়হীন ভঙ্গিতে তুই তুই করে সিলেটি ভাষায় বলল, এই তোর প্যান্টের...। ক্লাসের সব কটা ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হেসে উঠল। মেয়েদের আক্রমণ করা অনুচিত বিবেচনা করে সবচেয়ে উচ্চ স্বরে যে ছেলেটি হেসেছে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। হাতের কনুইয়ের প্রবল আঘাতে রক্তারক্তি ঘটে গেল। দেখা গেল ছেলেটির সামনের একটি দাঁত ভেঙে গেছে। হেড মাস্টার সাহেব আমাকে কান ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দিলেন—এ মহা গুন্ডা। তোমরা সাবধানে থাকবে। খুব সাবধান। পুলিশের ছেলে গুন্ডা হওয়াই স্বাভাবিক। ক্লাস ওয়ান ১২টার মধ্যে ছুটি হয়ে যায়। এই দুই ঘণ্টা আমি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সময়টা যে খুব খারাপ কাটল, তা নয়। স্কুলের পাশেই আনসার ট্রেনিং ক্যাম্প। তাদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। লেফট রাইট, লেফট রাইট। দেখতে বড়ই ভালো লাগছে। মনে মনে ঠিক করে ফেলাম, বড় হয়ে আনসার হব। ক্লাসের দ্বিতীয় দিনেও শাস্তি পেতে হলো। মাস্টার সাহেব অকারণেই আমাকে শাস্তি দিলেন। সম্ভবত প্রথম দিনের কারণে আমার ওপর রেগে ছিলেন। তিনি মেঘস্বরে বললেন, গাধাটা মেয়েদের সঙ্গে বসে আছে কেন? অ্যাই, তুই কান ধরে দাঁড়া। দ্বিতীয় দিনেও সারাক্ষণ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার, তৃতীয় দিনেও একই শাস্তি। তবে এই শাস্তি আমার প্রাপ্য ছিল। আমি একটা ছেলের স্লেট ভেঙে ফেললাম। ভাঙা স্লেটের টুকরায় তার হাত কেটে গেল। আবার রক্তপাত, আবার কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি। আমি ভাগ্যকে স্বীকার করে নিলাম। ধরেই নিলাম যে স্কুলের দু ঘণ্টা আমাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আজকের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি সত্যি আমাকে পাঠশালার প্রথম শ্রেণিটি কান ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাটাতে হয়েছে। তবে আমি একা ছিলাম না, বেশির ভাগ সময় আমার সঙ্গী ছিল শংকর। সে খানিকটা নির্বোধ প্রকৃতির ছিল। ক্লাসে শংকর ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু জুটল না। সে আমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে রইল। আমি যেখানে যাই, সে আমার সঙ্গে আছে। মারামারিতে সে আমার মতো দক্ষ নয়, তবে মারামারির সময় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আঁ-আঁ ধরনের গরিলার মতো শব্দ করে প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে যেত। এতেই অনেকের পিলে চমকে যেত। শংকরকে নিয়ে শিশুমহলে আমি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করে ফেলি। এই সময় স্কুলে কিছুদিনের জন্য কয়েকজন ট্রেনিং স্যার এলেন। ট্রেনিং স্যার ব্যাপারটা কী আমরা কিছুই জানি না। হেড স্যার শুধু বলে গেলেন, নতুন স্যাররা আমাদের কিছুদিন পড়াবেন। দেখা গেল, নতুন স্যাররা বড়ই ভালো। পড়া না পারলেও শাস্তি দেওয়ার বদলে মিষ্টি করে হাসেন। হইচই করলেও ধমকের বদলে করুণ গলায় চুপ করতে বলেন। আমরা মজা পেয়ে আরও হইচই করি। একজন ট্রেনিং স্যার, কেন জানি না, সব ছাত্রছাত্রীকে বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে পড়লেন। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করেন। আমার যা মনে আসে বলি আর উনি গম্ভীর মুখে বলেন, তোর এত বুদ্ধি হলো কী করে? বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। তোর ঠিকমতো যত্ন হওয়া দরকার। তোকে নিয়ে কী করা যায় তাই ভাবছি। কিছু একটা করা দরকার। কিছু করার আগেই স্যারের ট্রেনিংকাল শেষ হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন। তবে কেন জানি কিছুদিন পরপরই আমাকে দেখতে আসেন। গভীর আগ্রহে পড়াশোনা কেমন হচ্ছে তার খোঁজ নেন। সব বিষয়ে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়ে ক্লাস টুতে ওঠার সংবাদ পাওয়ার পর স্যারের উৎসাহে ভাটা পড়ে যায়। শুধু যে উৎসাহে ভাটা পড়ে তা-ই না, উনি এতই মন খারাপ করেন যে আমার নিজেরও খারাপ লাগতে থাকে। ক্লাস টুতে উঠে আমি আরেকটি অপকর্ম করি। যে রূপবতী বালিকা আমার হৃদয় হরণ করেছিল, তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করি, বড় হয়ে সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না। প্রকৃতির কোনো এক অদ্ভুত নিয়মে রূপবতীরা শুধু যে হৃদয়হীন হয় তা-ই না, খানিকটা হিংস্র স্বভাবেরও হয়। সে আমার প্রস্তাবে খুশি হওয়ার বদলে বাঘিনীর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খামচি দিয়ে হাতের দু-তিন জায়গার চামড়া তুলে ফেলে। স্যারের কাছে নালিশ করে। শাস্তি হিসেবে দুই হাতে দুটি ইট নিয়ে আমাকে নিল ডাউন হয়ে বসে থাকতে হয়। প্রেমিক পুরুষদের প্রেমের কারণে কঠিন শাস্তি ভোগ করা নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে আমার মতো এত কম বয়সে প্রেমের এমন শাস্তির নজির বোধ হয় খুব বেশি নেই। স্কুল আমার ভালো লাগত না। মাস্টাররা অকারণে কঠিন শাস্তি দিতেন। পাঠশালা ছুটির পর বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছে, এ ছিল প্রাত্যহিক ঘটনা। আমাদের পাঠশালায় প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা। কিন্তু একটা ক্লাস থেকে অন্য ক্লাস আলাদা করা নয়, অর্থাৎ কোথাও কোনো পার্টিশনের ব্যবস্থা নেই। কোনো ক্লাসে একজন শাস্তি পেলে পাঠশালার সবাই তা দেখে বিমলানন্দ ভোগ করত। আমার জীবনে শিক্ষকেরা এসেছেন দুষ্টগ্রহের মতো। আমি সারা জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি—আইসক্রিমওয়ালা, জুতা পলিশওয়ালা থেকে ডাক্তার, ব্যারিস্টার কিন্তু কখনো শিক্ষক হতে চাইনি। চাইনি বলেই বোধ হয় এখন জীবন কাটাচ্ছি শিক্ষকতায়। থ্রি থেকে ফোরে উঠব। বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। বাড়িতে বাড়িতে পড়াশোনার ধুম। আমি নির্বিকার। বই নিয়ে বসতে ভালো লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেই বসাটা পুরোপুরিই ভান। সবাই দেখল, আমি বই নিয়ে বসে আছি, এই পর্যন্তই। তখন প্রতি সন্ধ্যায় সিলেট শহরে মজাদার ব্যাপার হতো—তার নাম ‘লেমটন লেকচার’। কথাটা বোধ হয় ‘লন্ঠন লেকচার’-এর বিকৃত রূপ। ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে জায়গায় জায়গায় সিনেমা দেখায়: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ম্যালেরিয়া এইসব ভালো ভালো জিনিস। আমাদের কাজের ছেলে রফিক খোঁজ নিয়ে আসে আজ কোথায় লেমটন লেকচার হচ্ছে—মুহূর্তে আমরা দুজন হাওয়া। রফিক তখন আমার বন্ধুস্থানীয়। লেমটন লেকচারের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামানোর অনেক চেষ্টা করা হলো। নামান গেল না। মা হাল ছেড়ে দিলেন। এখন আর সন্ধ্যা হলে পড়তে বসতেও বলেন না। আমি মোটামুটি সুখে আছি বলা চলে। এমন এক সুখের সময়ে মাথামোটা শংকর খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, তার মা তাকে বলেছেন সে যদি ক্লাস থ্রি থেকে পাস করে ফোর-এ উঠতে পারে, তাহলে তাকে ফুটবল কিনে দেবেন। সে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্য। কী করে এক ধাক্কায় পরের ক্লাসে ওঠা যায়। একটা চামড়ার ফুটবলের আমাদের খুবই শখ। সেই ফুটবল এখন মনে হচ্ছে খুব দূরের ব্যাপার নয়। সেই দিনই পরম উৎসাহে শংকরকে পড়াতে বসলাম। যে করেই হোক তাকে পাস করাতে হবে। দুজন একই ক্লাসে পড়ি। এখন সে ছাত্র, আমি শিক্ষক। ওকে পড়ানোর জন্য নিজেকে প্রথম পড়তে হয়, বুঝতে হয়। যা পড়াই কিছুই শংকরের মাথায় ঢোকে না। মনে হয় তার দুই কানে রিফ্লেকটর লাগান। যা বলা হয় সেই রিফ্লেক্টরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, ভেতরে ঢুকতে পারে না। যাই হোক, প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হলো। দুজন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল, আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সমস্ত শিক্ষককে স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম। এই ক্ষুদ্র ঘটনা বাবাকে খুব মুগ্ধ করল। বাসায় যে-ই আসে বলেন, আমার এই ছেলের কাণ্ড শুনুন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছে। কারণ হলো...। এই ঘটনার আরেকটি সুফল হলো, বাবা মাকে ডেকে বলে দিলেন—কাজলকে পড়াশোনা নিয়ে কখনো কিছু বলার দরকার নেই। ও ইচ্ছা হলে পড়বে, ইচ্ছা না হলে না। তাকে নিজের মতো থাকতে দাও। আমি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম। এই আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ, বিশেষ বিবেচনায় মাথামোটা শংকরকে প্রমোশন দিয়ে দেওয়া হলো। তার মা সেই খুশিতে তাকে একটা এক নম্বরি ফুটবল এবং পাম্পার কিনে দিলেন। গ্রিন বয়েজ ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হলো। আমি ক্লাবের প্রধান এবং শংকর আমার অ্যাসিসটেন্ট। আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক আমাদের ফুলব্যাক। অসাধারণ খেলোয়াড়। (নির্বাচিত অংশ) সূত্র: আমার ছেলেবেলা, হুমায়ূন আহমেদ। আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়ায়, কাকলী প্রকাশনী, ২০০২ যেভাবে বেড়ে উঠি - নেইমার৷ শৈশব থেকেই আমি সবার সঙ্গে মজা করতে, খেলতে আর নিজেকে নিয়ে থাকতে পছন্দ করি। ওই সময়টায় সমবয়সীদের সঙ্গে অনেক দুষ্টুমি করেছি, সেসবের মধুর স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমার শৈশব সাধারণ ছিল, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে করা সব দুষ্টুমি সেটাকে রঙিন করে তুলেছে। রাস্তায়-সাগরতীরে বল নিয়ে খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, বাইকে চড়া, লুকোচুরি খেলা—কী অসাধারণ একটা সময় কাটিয়েছি! আমার এক আঙ্কেল ও আন্টি আছেন, যাঁরা ভালো গিটার বাজাতে পারেন। তাই আমাদের বাসায় সব সময় গান চলতে থাকত। সাম্বা, প্যাগোডা, গস্পেল—যেকোনো ধরনের সুরই আমাদের বাসায় শোনা যেত, সে সঙ্গে নাচ তো আছেই। আমার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার বাবার। আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশটাই ছিল ফুটবলকে ঘিরে। যখনই সুযোগ পেতাম, বাবার সঙ্গে ট্রেনিংয়ে যেতাম, তাঁর ম্যাচ দেখতাম। তাঁর হাত ধরেই আমার খেলতে শেখা এবং এখনো তিনি আমাকে খেলা নিয়ে উপদেশ দেন। তিনি সব সময় বলেন, তিনি এমন খেলোয়াড় ছিলেন যে সামর্থ্যের পুরোটুকু দিয়ে খেলতেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শেষদিকটা আমার মনে আছে, কারণ তিনি যখন খেলা শুরু করেছিলেন, তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। মাঝেমধ্যে তাঁর খেলার ভিডিওগুলো দেখি। একটি ভিডিওতে তিনি হেড দিয়ে গোল করার পর পাগলের মতো নাচতে আরম্ভ করলেন। এখন আমি গোলের পর সেলিব্রেশনের অনুপ্রেরণা তাঁর কাছ থেকেই পাই। রাস্তায় আমি প্রচুর খেলেছি, সাগরতীরেও। ছোটবেলা থেকেই ফুটসাল আমার কাছে একটা নেশার মতো। (ফুটসাল ৫/৬ জন মিলে ছোট পরিসরে খেলা ফুটবল খেলা বিশেষ) ফুটসাল পিচেই আমার ফুটবল খেলা শেখার শুরু। আমি মনে করি, একজন খেলোয়াড়ের ট্রেনিংয়ে ফুটসাল অনেক দরকারি, এটা দ্রুত চিন্তা করতে শেখায়। শর্ট সার্ভ করতে, জলদি পাস দিতে আর জোরে শুট করতে ফুটসাল সাহায্য করে। ফুটবল একটা দলীয় খেলা এবং আমি মাঠে নামি দলকে সাহায্য করতে। একটা দলে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অবশ্যই ভূমিকা রাখে, কিন্তু খেলায় শেষ পর্যন্ত দলই জয়ী হয়। খেলায় উন্নতির কোনো সীমা নেই। আমার বাবা ছোটবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন ট্রেনিংয়ে নিজের শক্তির শেষটুকু ঢেলে দিয়ে আসতে এবং আমি এখনো সেটা মেনে চলি। বাঁ পায়ে শট নেওয়া, মার্কিং, ফিনিশিং, হেডিং—উন্নতির হাজারো জায়গা আছে এবং তাতে থেমে গেলে চলবে না। আমি জানি, আমি অতটা লম্বা নই, তাই হেডিংয়ে প্রচুর সময় দিয়েছি। সঠিক মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে বলে মাথা ছোঁয়ানো—এই কাজটি করতে অনেক ট্রেনিং ও মনোযোগের প্রয়োজন। আমার কাছে আনন্দে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের ভেতরে-বাইরে আমি একই ব্যক্তি। বাসায় আমি কার্ড খেলি, ভিডিও গেম নিয়ে মেতে থাকি, গান শুনি, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, বারবিকিউ বানাই। তখন মজা করাটাই আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়। গোল করার অনুভূতিটা স্বর্গীয়, কিন্তু এর চেয়েও দামি অনুভূতি হলো দলকে জেতাতে ভূমিকা রাখা। যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনে স্বপ্ন থাকে নিজের দেশের হয়ে খেলার। যে জার্সি পরে আমার ছোটবেলার মহানায়কেরা খেলেছেন, ব্রাজিলের সেই জার্সি পরার অনুভূতিটা আমি কখনো ভুলতে পারব না। প্রথম যেদিন আমি জাতীয় দলে ডাক পেলাম, আমার আশৈশবলালিত স্বপ্ন পূরণ হলো। মাঠে আমার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে খেলি দেশের জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য, যাঁরা জীবনে এতকিছু পেতে আমাকে সাহায্য করেছেন। ব্রাজিল দলের অন্যতম স্ট্রাইকার নেইমার৷ তাঁর জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। নেইমার ১২৯ ক্লাব ম্যাচে ৬৩ গোল ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ ম্যাচে ৩৩ গোল করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘সাউথ আমেরিকান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ সম্মান লাভ করেন তিনি। ২০১১ সালে ফিফা পুসকাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে দ্য গার্ডিয়ান নেইমারকে পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় ৬ষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেয়। সূত্র: হাইসনোবিটি ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন মনীষ দাশ আমি ফুটবল জাদুকর নই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার পেলে৷ ১৯৪০ সালে ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেন ফুটবলের এই মহাতারকা৷ ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য তিনি৷ ফুটবলে বর্ণবাদ বিলোপে ফিফার দূত ও ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন৷ ছয় বছর বয়সে আমি প্রথম ফুটবলে কিক করি৷ সেদিন ছিল আমার জন্মদিন৷ এ জন্য আমার বাবার ফুটবলার বন্ধু সোসা আমাকে একটি চামড়ার বল উপহার দেন৷ সেটিই ছিল আমার সত্যিকারের কোনো বলে লাথি মারার অভিজ্ঞতা৷ তার আগে আমরা মোজার মধ্যে কাগজ ভরে ফুটবল বানিয়ে খেলতাম৷ আমাকে অনেকে জাদুকর ভেবে ভুল করে৷ আমি আসলে জানি না কেন তারা ভুল করে৷ এটা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন৷ কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ফুটবলের জন্যই আমাকে সবাই চেনে৷ ফুটবল ছাড়া আমার অস্তিত্ব শূন্য৷ ফুটবল একটি পরিবারের মতন, বিশ্বপরিবার৷ এটা কোনো ছোটখাটো পরিবার নয়, সারা বিশ্বই ফুটবল পরিবার৷ আমি এই পরিবারের জন্য কাজ করে যাই৷ আমি সব সময় চেষ্টা করি অন্যের মঙ্গল করতে৷ আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে অন্যকে খুশি রাখার৷ আমি আগে পা দিয়ে ফুটবল খেলতাম, এখন হৃদয় দিয়ে খেলি৷ আমি ইউনেসকোর হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করি৷ আমি সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টায় থাকি সব সময়৷ আমার ফুটবল খেলার অনুপ্রেরণা অনেকে৷ তারুণ্যে অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার বাবা দোনদিনহো আর ব্রাসিলিয়ার মধ্যমাঠের ফরোয়ার্ড জিজিনহো৷ আমার চোখে তিনি ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার৷ মিশেল প্লাতিনি, বেকেনবাওয়ার অসাধারণ ফুটবলার ছিলেন৷ লেভ ইয়াসিন ছিলেন অনন্য এক গোলরক্ষক৷ ফুটবল মাঠে ক্রুইফ, ডি স্টেফানো, জিকো যাঁর যাঁর দিনে হয়ে উঠতেন ভয়ংকর৷ ম্যারাডোনাও ফুটবলের মাঠে দুর্জেয়৷ জর্জ বেস্ট তো ইউরোপ কাঁপানো ফুটবলার৷ ফুটবল আমাকে সব দিয়েছে—খ্যাতি, সম্মান, অর্থ৷ এখন আমি ফুটবলকে দিতে চাই৷ আমি মানুষকে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা ফেরত দিতে পারব না৷ কিন্তু তার পরও আমি তাদের কিছু দিতে চাই৷ আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই৷ এখন যারা শিশু, আমি তাদের ‘হ্যালো’ বলে ডাক দিই৷ এতে তারা যতটা খুশি হয়, আমি তার চেয়েও বেশি খুশি হই৷ আমি পেশাদার ফুটবল ছেড়েছি ৩০ বছর আগে৷ এখন যারা আট বছর, পঁাচ বছরের শিশু, আমাকে বিমানবন্দরে দেখলে চিৎকার করে ওঠে, ‘মা, দেখো, পেলে!’, ‘বাবা, দেখো, ওই যে পেলে!’ এটা নিঃসন্দেহে অন্য রকম একটি অনুভূতি৷ আমার জন্য এটাই তো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার৷ আমি ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের জন্মগ্রহণ করি৷ আমার নাম অনেক লম্বা! এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো—একবার বলা শুরু হলে আর শেষ হয় না; যদিও আমার এত বড় নাম ছোটবেলা থেকে কখনোই পছন্দের ছিল না৷ আমার নামকরণ করা হয় বিখ্যাত উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের নাম থেকে৷ আমার বাবা ভালো ফুটবলার ছিলেন৷ তিনি সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলতেন৷ তাঁর ঝুলিতে অনেকগুলো গোলও ছিল৷ আমি ছোটবেলা থেকে চাইতাম বাবার মতো হতে৷ কিন্তু একটা ইনজুরি বাবার খেলা বন্ধ করে দেয়৷ আমি শহরের শিশু-কিশোরদের সঙ্গে অনেকটা সময় ফুটবল খেলেছি৷ তাদের কেউ একজন আমাকে ‘পেলে’ বলে ডাকত৷ আমি প্রতিবাদ করতাম, ‘না, পেলে না, আমাকে পেলে নামে ডেকো না৷ আমার নাম এডসন৷’ যারা আমার ভুল নামে ডাকত, আমি তাদের সঙ্গে মারামারি করতে ছুটতাম৷ আমার স্কুলেও একই ঘটনা ঘটত৷ আমাকে পেলে নামে সবাই খ্যাপাত৷ আমি সেখানেও মারামারি করতাম৷ আমাকে স্কুল থেকে দুদিনের জন্য বহিষ্কার করা হয়৷ আমার মা-বাবাকে স্কুলে ডাকা হয়৷ আমি তাঁদের বলি, ‘আমাকে পেলে নামে সবাই ডাকে বলে আমি মারামারি করেছি৷ আমি এই বাজে নাম পছন্দ করি না৷ আমার নাম এডসন৷’ এর পরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠল৷ আমাকে সবাই ‘পেলে–পেলে–পেলে’ বলে ডাকা শুরু করল! অনেক সাংবাদিক আমার নামের অর্থ খুঁজতে উদ্গ্রীব৷ পেলে নামের অর্থ কী? তারা আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু নামের অর্থ বের করতে পারেনি৷ শেষ পর্যন্ত তারা ‘মাদাম পেলে’ নামে এক আগ্নেয়গিরি খুঁজে পায়৷ ব্রাজিলে অনেক ফুটবলারের মধ্যে একজন গোলরক্ষক আমার বাবার বন্ধু ছিলেন৷ তাঁর নাম ছিল ‘বিলে’৷ আমার ধারণা, তাঁর নামের বিকৃত উচ্চারণেই আমার নাম৷ স্রষ্টা ভালো জানেন, আমি জানি না৷ প্রথম বিশ্বকাপে খেলা ছিল অনন্য এক অভিজ্ঞতা৷ এটা ছিল স্বপ্নের মতন৷ প্রথম ম্যাচে গোল করার পরে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল৷ তার পরের সময়টুকু ইতিহাস৷ ফরাসিদের বিপক্ষে আমি তিন গোল করি আর ফাইনাল খেলা ছিল বিস্ময়কর স্বপ্ন! বিশ্বকাপ জয় ছিল আমার জন্য বিশেষ একটি ঘটনা৷ আত্মবিশ্বাস থাকলে কেউ কাউকে দমিয়ে রাখতে পারে না৷ আমার বাবা আমাকে বলতেন, ‘স্রষ্টা তোমাকে ফুটবল খেলার অনন্য দক্ষতা দিয়েছেন৷ এটা তাঁর উপহার৷ আত্মবিশ্বাস রেখে সেই উপহার কাজে লাগাও৷’ সূত্র: এনটিভি নেটওয়ার্কসের গ্লোবাল লিডার্স অনুষ্ঠান, জিকিউ ম্যাগাজিন ও ফোরফোরটু’কে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে জাহিদ হোসাইন খান সফল ড্রপআউট! জেমস ক্যামেরন চলচ্চিত্রকার ‘টাইটনানিক’খ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা জেমস ক্যামেরন জীবন দুই-দুইবার ড্রপআউট হয়েছেন। ১৯৭১ সালে পরিবার কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালে তিনি ১৭ বছর বয়সে লুথেরান হাইস্কুল অব অরেঞ্জ কাউন্টিতে ভর্তি হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নাম কাটা পড়ে তাঁর। এর পরে ট্রয় হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিকের বাকি পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ১৯৭৩ সালে জেমস ক্যালিফোর্নিয়ার ফুলারটন কলেজে ভর্তি হন। প্রথমে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার জন্য নাম লেখালেও পরবর্তী সময়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু এক বছর হওয়ার আগেই কলেজ পালান তিনি। কলেজ ছেড়ে নানান কাজে হাত পাকিয়ে শেষ পর্যন্ত সিনেমা জগতে চলে আসেন। লেডি গাগা সংগীতশিল্পী কনভেন্ট অব স্কেয়ার্ড হার্ট নামের রোমান ক্যাথলিক স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী অ্যাঞ্জেলিনা। বই পড়তে যেমন আগ্রহ, তেমনি পিয়ানো বাজানোতে আগ্রহ তাঁর সমান। হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীতবিষয়ক এক বৃত্তি পান। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে গান লেখা আর গাওয়াতেই আগ্রহ বাড়ে তাঁর। দ্বিতীয় সেমিস্টারে এসেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। বাবার আপত্তি ছিল। মেয়ে বাবাকে শর্ত দিয়েছিলেন ‘সংগীতে ক্যারিয়ার না বানাতে পারলে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন।’ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া সেই অ্যাঞ্জেলিনা এখন তরুণদের কাছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লেডি গাগা। টাইগার উডস গলফ খেলোয়াড় ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েস্টার্ন হাইস্কুলে পড়ার সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সে ইউএস জুনিয়র অ্যামেচার গলফ চ্যাম্পিয়ন হন টাইগার উডস। গলফের অসিলায় বৃত্তি নিয়ে হাইস্কুল পাস করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। অর্থনীতি বিষয়ে পড়া শুরু করেন। কিন্তু মাত্র দু বছরেই রণে ক্ষান্ত দেন। পড়াশোনার পাট না চুকিয়েই পেশাদার গলফার হয়ে ব্যস্ত জীবন শুরু করে দেন টাইগার। অত:পর বিশ্বসেরা গলফার। সূত্র: টাইম মাগাজিন অনলাইন ফুটবল আমার ধ্যানজ্ঞান : লিওনেল মেসি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার আজেন্টিনার লিওনেল মেসি। জন্ম আর্জেন্টিনায়, ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। বিশ্বসেরার স্বীকৃতিস্বরূপ মেসি চারবার ফিফা ব্যালেন ডি’অর সম্মাননা লাভ করেন। তখন আমি বেশ ছোট। জন্মদিনের এক উপহার পেয়ে আমি চমকে যাই। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমার এক আত্মীয় আমার হাতে ভিন্ন এক জীবন উপহার দেয়—এক নতুন ফুটবল। তিন কিংবা চার বছর বয়সে পাওয়া সেই উপহারের জন্য আজ আমি এখানে। সেই উপহার আমার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে বড়দিন কিংবা জন্মদিন সব সময়ই উপহার হিসেবে আমার চাওয়া ছিল ফুটবল। খুব সাধারণ এক ফুটবলপাগল পরিবারে ছিল আমার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা-চাচাদেরও ছিল ফুটবল নিয়ে ভীষণ মাতামাতি। বাবা তো এক ফুটবল ক্লাবের কোচের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুলে যেতাম। সেখান থেকে ফিরেই মুখে কিছু একটা পুরে রাস্তায় ফুটবল খেলতে ছুটতাম। আমি সৌভাগ্যবান আমার সাধারণ পরিবারের জন্য। বাবার দিনভর পরিশ্রমই ছিল আমাদের একমাত্র রুজি। তিন ভাইয়ের জন্য ছিল বাবা-মায়ের সব আদর। ছোটবেলায় আমি বেশির ভাগ সময়ই রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। বাড়ির বাইরে যেখানেই সুযোগ পেতাম, সেখানেই খেলতাম। সত্যি বলতে কি, পাঁচ বছর বয়স থেকে ফুটবল আমার বন্ধু। পাড়ার বড় ভাইয়েরা রাস্তার ফুটবল ম্যাচে আমাকে নিতে চাইত না। আমার কাছ থেকে যখন বল নিতে পারত না, তখন তারা আমাকে দুষ্টুমি করে মারধর করতে চাইত। রাস্তার ওপর আমার ফুটবল খেলা নিয়ে আমার ভাই ভীষণ দুশ্চিন্তা করতেন। রোজিওতে আমার জন্ম। সেই এলাকার ছোট ফুটবল ক্লাব গ্র্যান্ডোলিতে আমাদের পুরো পরিবারের সবাই বয়স অনুসারে সেই ক্লাবে খেলতাম। মা–ই থাকত শুধু খেলার বাইরে। আমরা প্রতি রোববার সারা দিন ক্লাবের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতাম। মা-দাদিও ছিলেন সেই ক্লাবের পাড় সমর্থক। বাবা তখন ক্লাবে কোচিং করাতেন, তিনিই আমার প্রথম কোচ। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস করতাম। সেই রাস্তা, সেই স্মৃতি, সেই সময়—সব আমার বদলে যায় খুব ছোট থাকতেই। স্পেনের বার্সেলোনায় আসার পরেই আমার সব পাল্টে যায়। ফুটবল খেলার বন্ধু, স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠী, পরিবার এবং নিজের দেশ ছেড়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক মহাসাগর দূরে চলে আসি। এটা ছিল আমার জন্য ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা। একদিকে বার্সেলোনা থাকার নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ছিল বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট। প্রথম প্রথম অনেক মন খারাপ হতো। একা একা লাগত। কান্নাকাটি করতাম অনেক সময়। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিতাম। ধীরে ধীরে আমি নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করি। আমার স্বপ্ন ছিল বার্সেলোনার মূল দলে ফুটবল খেলা। আমার জীবনের সবকিছু শিখেছি আমি বার্সেলোনাতে এসে। এখানেই আমি বড় হই, লেখাপড়াও এখানকার স্কুলে। কিশোর বয়স থেকেই ফুটবল আমার ধ্যান-জ্ঞান। আমি ছোটবেলায় যেভাবে খেলতাম, এখনো সেভাবে খেলি। আমার খেলার ঢং একই রকম। আমি নিজের মতো খেলে যাই। বার্সেলোনাতে খেলে আমি ফুটবল নিয়ে অনেক কৌশল শিখতে পেরেছি। কিশোর বয়সে প্রথমদিকে খেলার সময় ফুটবল কোচ ফ্যাবিও কাপেলো আমাকে ‘ছোট শয়তান’ তকমা দিয়েছিলেন। আমার জন্য সেটা ছিল খুবই আনন্দের। তিনি ফুটবল কোচ, তাঁর কাছ থেকে এত ছোট বয়সে প্রশংসা পাওয়া নিশ্চয়ই দারুণ ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগত সম্মাননা কিংবা নিজে বেশি গোল করতে আগ্রহী নই। আমি আমার দলের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কারটাই আনতে চাই। আমি পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হওয়ার চেয়ে একজন ভালো মানুষ হতেই বেশি আগ্রহী। কারণ, সবশেষে আমি যখন অবসরে যাব, তখন প্রত্যাশা থাকবে সবাই যেন আমাকে বিনয়ী হিসেবেই চেনে। আমি গোল করতে পছন্দ করি কিন্তু বন্ধুত্ব করতেও আগ্রহী বেশি। দলের ফুটবলাররা আমার বন্ধু। তাঁদের ছাড়া আমি তো আসলে শূন্য। আমি হারতে ভীষণ অপছন্দ করি। সেটা বাস্তব জীবনেও। দরিদ্রতা আমাকে রাগায়। আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে দারিদ্র্যই বাস্তবতা। সেখানে অনেক শিশু আছে, যাদের বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করতে হয়। অন্য কিছু করার উপায় নাই বলে অনেক কম বয়সে কাজে করতে হয়। আমি বার্সেলোনাতে একটু ভালো পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছি। বাবার সঙ্গে থাকার সুযোগ পাই। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন। অনেক বাবা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তাঁদের সন্তানকে বড় করতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তথ্যসূত্র: এল পাই্যজ (২০১২) এবং ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনে (২০১৩) দেওয়া মেসির সাক্ষাৎকার। মেসি লেখাটি লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান আমার জীবনটাই যেন সিনেমা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা৷ জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জেতে। ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোলের একটি ‘গোল অব সেঞ্চুরি’র মর্যাদা পায়, আর অন্যটি ‘হ্যান্ড অব গড’ হিসেবে ব্যাপক আলোচিত। ফিফার বিশ শতকের সেরা ফুটবলারের তালিকায় তিনি ও ব্রাজিলের পেলে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেন৷ মাঝেমধ্যে আমি চিন্তা করি, আমার পুরো জীবনই যেন এক সিনেমা৷ সিনেমার রিলে যেন আমার জীবনের সব ছবি ধারণ করে রাখা আছে৷ সবাই ছোটবেলায় বিখ্যাত কাউকে অনুসরণ করে৷ আমার ছোটবেলায় আর্জেন্টিনায় সত্যিকারের বিখ্যাত অনুকরণীয় ফুটবলার কেউ ছিল না৷ ফুটবল ছিল তখন আর্জেন্টিনার গরিব আর বস্তিতে থাকা ছেলেদের মুক্তির একটা বড় উপায়৷ দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচতে আমরা ফুটবলকে বেছে নিতাম৷ বুয়েনস এইরেসে আমরা খুব ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকতাম৷ ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে যেত৷ আমার বয়স যখন তিন, তখন আমার এক কাজিন আমাকে একটা চামড়ার বল উপহার দেয়৷ সেটাই ছিল আমার প্রথম বল৷ আমি সেই বলটিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতাম। আমার বাড়ির পেছনেই ছিল চতুর্থ লিগের এক ফুটবল দলের স্টেডিয়াম৷ আমি সারা দিন এলাকার আনাচকানাচে ফুটবল খেলতাম৷ সন্ধ্যায় অন্য সব ছেলেপেলে বাড়ি ফিরে গেলে আমি আরও খেলতাম৷ অন্ধকার হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরও আমার পায়ে ফুটবল থাকত৷ অন্ধকারে আমি চোখে কিছুই দেখতাম না৷ সে জন্য আমি শুধু সামনের দিকে বল কিক করে যেতাম৷ আমি দুটি কাঠি দিয়ে গোলপোস্ট বানাতাম৷ অন্ধকারে সেই গোলপোস্টের অদৃশ্য জালে কিকের পর কিক করে যেতাম৷ এর বছর দশেক পর, যখন আমি প্রথম ক্লাব আর্জেন্টিনো জুনিয়র্সের হয়ে চুক্তি করি, তখন বুঝেছিলাম অন্ধকারে সেই ফুটবলচর্চা আমার কত কাজে লেগেছে৷ আমার প্রথম আয় করা টাকা দিয়ে আমি এক জোড়া ট্রাউজার কিনেছিলাম৷ আমার জন্ম বুয়েনস এইরেসের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অংশ ফ্যাবেল ফিওরিটোতে৷ সেই অঞ্চলের দারিদ্রের মাত্রা আর আমার ছোটবেলার বন্ধুরা এখনো সেই আগের মতোই আছে৷ শুধু রাজনীতিবিদ আর সরকারি লোকেরাই দিনকে দিন ধনী হচ্ছে৷ আমার সামনেও ধনী হওয়ার অনেক সুযোগ ছিল৷ কিন্তু আমি সেই সুযোগকে ‘না’ করে দিই৷ আমার ‘না’ বলার পেছনে যুক্তি ছিল, আমাকে ধনী হতে হলে গরিবের কাছ থেকে চুরি করতে হবে৷ আমি একবার গরিবদের কথা বলার জন্য আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ আমার একটি কথাও শোনেনি৷ আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল কিংবা কিউবা সব জায়গাতেই একই সমস্যা—দারিদ্র। ধনী দেশগুলো জন্য আমাদের এই দীনতা৷ এটা সত্য, কোনো কিছু বদলে দেওয়া বেশ কষ্টকর৷ কিন্তু এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা সেই কুশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে জানি৷ কেউ গরিবদের পক্ষে কথা বলে না৷ সেটা স্বয়ং পোপ থেকে শুরু করে সব দেশের রাজনীতিবিদেরা৷ বার্লিন ওয়াল ধ্বংসের পরে সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে নয় গুণ৷ এদের দেখার কেউ নেই৷ আমি সব সময় আমার বাবার কথা মনে আনি৷ বাবা যখন কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতেন, আমরা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷ আট সন্তানের জন্য তিনি বেশি কিছু আয়ও করতে পারতেন না৷ আমরা চুপ করে বাড়িতে বসে থাকতাম৷ আমাদের কোনো খাবার থাকত না৷ আমাদের কষ্ট কেউ বুঝবে না৷ আপনি যদি ক্ষুধার্ত না হন, তাহলে আমার কষ্ট বুঝতে পারবেন না৷ আমার বোন কম খেত, যেন আমি রাতের বেলায় বেশি খেতে পারি৷ এমন পরিস্থিতিতে আপনার অন্য মানুষের প্রতি মায়া, মমতা আর ভালোবাসা তৈরি হবে৷ আমার মা পেটব্যথার ভান ধরে কিছু খেতেন না৷ তিনি সেই খাবার তাঁর সন্তানদের জন্য রেখে দিতেন৷ পাত্রের শেষ দানাটুকু পর্যন্ত তিনি আমাদের দিয়ে দিতেন৷ এই কষ্ট নিয়েই আমার বেড়ে ওঠা৷ আমার মা আমাকে মিথ্যা বলে খাওয়াতেন৷ কেউ কেউ একে কল্পকাহিনি বলে উড়িয়ে দেয়৷ কিন্তু আমার কাছে দরিদ্রতাই সত্য, বাস্তবতা৷ আমি সেসব কষ্টের সময়ের কথা ভুলিনি৷ আমি যে ভুলতে পারব না৷ আমার বাবা কাভানটাকা মার্কেটে কাজ করতেন৷ তিনি সব সময় ভারী ব্যাগ বহন করতেন৷ বৃদ্ধ বয়সেও তিনি ঘাড়ে ব্যাগ টানতেন৷ বাবা যখন বাড়ি ফিরতেন, তাঁর পিঠ আর ঘাড়ে বরফের ব্যাগ রেখে দিতেন মা৷ আমরা ভাইবোনেরা অবাক হয়ে তা দেখতাম৷ আমি ছোটবেলায় কখনো জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে পারতাম না৷ আমাদের কখনোই টাকাপয়সা হাতে থাকত না৷ জন্মদিনে আমার পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন আমার গালে চুমু দিত৷ সেই চুমুই ছিল আমার জন্য বড় উপহার৷ আমি ম্যারাডোনা, যে কিনা গোল করতে পারে, আবার ভুল করতে জানে৷ আমি সব বাধা নিজের মতো করে লড়তে জানি৷ আমার মা সব সময় চিন্তা করতেন আমিই সেরা৷ নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাই সবচেয়ে কঠিন শ্রমের কাজ৷ আমি ছোটবেলা থেকে আমার মায়ের বিশ্বাসকে শক্তভাবে ধারণ করেছি৷ ফুটবল মাঠে বলে পেছনে দৌড়ানোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের স্মৃতি৷ সমালোচকেরা আমার নামে অনেক কিছুই বলে৷ কিন্তু কেউ বলতে পারবে না আমি ঝুঁকি নিতে পারি না৷ ম্যারাডোনার আত্মজীবনী এল ডিয়েগো ও সার্বিয়ান সংবাদপত্র পলিটিকায় দেওয়া ম্যারাডোনার সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান হতে হবে আশাবাদী: বিল গেটস মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের অন্যতম। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি মাইক্রোসফটের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে জনকল্যাণমূলক নানা কাজে যুক্ত আছেন। অভিনন্দন, ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা৷ মেলিন্ডা ও আমি আজ এখানে উপস্থিত হতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত৷ তোমাদের এই ক্যাম্পাস অনেক দিক থেকেই অসাধারণ৷ তবে আমাদের যদি একটি শব্দে বলতে হয় স্ট্যানফোর্ডের কোন বিষয়কে আমরা সবচেয়ে ভালোবাসি, তা হবে আশাবাদী মনোভাব৷ ১৯৭৫ সালে এই আশা নিয়েই আমি বোস্টনের এক কলেজ ছেড়ে এসে কাজে নেমে পড়েছিলাম৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কম্পিউটার ও সফটওয়্যার পৃথিবীজুড়ে মানুষের জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারবে, পৃথিবীকে আরও অনেক উন্নত করে তুলবে৷ কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে৷ আমরা যা শিখেছি, আজ সেসব তোমাদের বলতে চাই৷ আর জানাতে চাই, কীভাবে আমরা সবাই আরও অনেক মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে পারি৷ যখন পল অ্যালেন আর আমি মাইক্রোসফট শুরু করেছিলাম, তখন আমদের লক্ষ্য ছিল কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো৷ ১৯৯৭ সালে আমি ব্যবসার কাজে প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায় যাই৷ একদিন আমি কৌতূহলবশত শহরের একটু দূরে সোয়েটো নামে একটা জায়গায় যাই; এমন জায়গা আমি জীবনে কখনো দেখিনি৷ মাইক্রোসফট সেখানে একটি কমিউনিটি সেন্টারে কম্পিউটার ও সফটয়্যার বিতরণ করেছিল, যেভাবে আমেরিকায় আমরা কাজ করতাম৷ কিন্তু আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝে গেলাম, এটা আমেরিকা নয়৷ এর আগে আমি দারিদ্র্যকে দেখেছিলাম পরিসংখ্যানে, নিজের চোখে নয়৷ সেখানে গিয়ে আমি দেখলাম, কীভাবে মানুষ বিদ্যুৎ, পানি, টয়লেট ছাড়াই বস্তিতে থাকছে৷ বেশির ভাগের পায়েই কোনো জুতা ছিল না, জুতা পায়ে হাঁটার মতো রাস্তাও ছিল না৷ যে কমিউনিটি সেন্টারে আমরা কম্পিউটার দান করেছিলাম, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না৷ তাই তারা ২০০ ফুট লম্বা তার দিয়ে ডিজেলচালিত একটি জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে কম্পিউটার চালিয়ে রেখেছিল৷ অবস্থা দেখে আমি ভালোভাবেই বুঝলাম, যে মুহূর্তে আমি আর আমার সঙ্গের লোকজন চলে যাব, তৎক্ষণাৎ এই জেনারেটরও অন্য কোথাও চলে যাবে৷ আর কমিউনিটি সেন্টারের লোকেরাও তাদের জীবনের অন্য হাজার সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত হয়ে পড়বে; সেসব সমস্যা কখনো কম্পিউটার দিয়ে সমাধান করা যায় না৷ গণমাধ্যমের সামনে এসে আমি আগে থেকে তৈরি করে রাখা বক্তৃতা পড়ছিলাম৷ বলছিলাম, ‘সোয়েটো প্রযুক্তির বিভাজনকে ঘুচিয়ে দেওয়ার যাত্রায় একটি মাইলফলকের নাম৷’ কিন্তু মুখে যা-ই বলি, আমি বুঝতে পারছিলাম, এসব কথার কোনো অর্থ নেই৷ সোয়েটোতে যাওয়ার আগে আমি ভাবতাম, আমি পৃথিবীর সমস্যা বুঝি, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো নিয়েই আমার কোনো ধারণা ছিল না৷ আমার এত অসহায় লেগেছিল যে আমি নিজের বিশ্বাসকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলাম, আদৌ কি উদ্ভাবনের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব? আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, দ্বিতীয়বার আফ্রিকায় পা দেওয়ার আগে আমাকে বুঝতে হবে দারিদ্র্য আসলে কী৷ অনেক পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় আমি একটি যক্ষা হাসপাতাল দেখতে গিয়েছিলাম৷ সেটি একটি বিশেষ ধরনের যক্ষা রোগীদের জন্য, যাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগেরও কম৷ গোটা হাসপাতাল রোগীদের ভিড়ে উপচে পড়ছে৷ রোগীদের মধ্যে আমি এক নারীর সঙ্গে কথা বললাম, তার বয়স মাত্র ত্রিশের কোঠায়৷ সে আগে এক যক্ষা হাসপাতালে কাজ করত, একদিন তার নিজেরও যক্ষা ধরা পড়ে, সঙ্গে এইডস৷ সে জানত, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে৷ আর তার মৃত্যুর পর যখন সেই বিছানা খালি হয়ে যাবে, সেখানে জায়গা করে নিতেও রোগীদের এক বিশাল লাইন অপেক্ষা করে আছে৷ তারা অপেক্ষা করছে সেই দিনের৷ আমি গাড়িতে উঠে সেখানকার এক ডাক্তারকে বললাম, ‘হ্যাঁ, আমি জানি এ ধরনের যক্ষা সারিয়ে তোলা মুশকিল৷ কিন্তু কোনো না কোনো উপায় নিশ্চয়ই আছে৷ এসব মানুষের জন্য আমাদের কিছু করতেই হবে৷’ আমি আজ আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি এ বছর আমরা যক্ষার এক নতুন ধরনের ওষুধের পরীক্ষা করতে যাচ্ছি৷ আগে যেখানে ১৮ মাস ধরে প্রায় দুই হাজার ডলার খরচের পরও শতকরা ৫০ জনের বেশি রোগীকে সুস্থ করা যেত না, এখন সেখানে ছয় মাসের চিকিৎসায় ১০০ ডলারের কম খরচেই শতকরা ৮০ থেকে ৯০ জন রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হবে৷ এখানেই আশাবাদের শক্তি নিহিত৷ কে বলেছে আমরা দারিদ্র্য কিংবা রোগব্যাধিকে মির্মূল করতে পারব না? আমরা অবশ্যই পারব৷ সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন, আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে অনুপ্রেরণা জোগায়৷ কিন্তু সমস্যাকে নিজের চোখে না দেখলে শুধু আশা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা যায় না৷ আমি হতাশাবাদীদের দলে নই৷ কিন্তু আমাদের স্বীকার করতে হবে যে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে যদি আমরা বৈষম্য দূরীকরণের কাজে না লাগাই, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এমন সব উদ্ভাবন নিয়ে বসে থাকব, যা পৃথিবীকে আরও বিভক্ত করে ফেলবে৷ উদ্ভাবন দিয়ে কী হবে, যদি তা স্কুলে শিক্ষার মান না বাড়ায়? যদি ম্যালেরিয়া নির্মূল করা না যায়, দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব না হয়, দরিদ্র কৃষকের অন্নের নিশ্চয়তা না থাকে? তোমরা স্নাতকেরা অসংখ্য উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবে, পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ তোমাদের বয়সে আমি পৃথিবীকে যতটা চিনতাম, আমি বিশ্বাস করি, আজ তোমরা তার চেয়ে অনেক বেশি জানো৷ আমি যা করেছি, তোমরা তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করতে পারবে, যদি তোমরা এতে তোমাদের মনপ্রাণ ঢেলে দাও৷ আমি সেই প্রত্যাশায় রইলাম৷ সূত্র: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট। ১৫ জুন, ২০১৪ যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বিল গেটসের বক্তব্যের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার শুরুতে হ্যারি পটার বইটি কেউ ছাপতেই চায়নি ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। ইংল্যান্ডের এক গ্রামে থাকে বাবা, মা আর তাঁদের ছোট্ট দুটি মেয়ে। বড় বোনের কাছে ছোট বোনের আবদারের শেষ নেই, গল্প না শোনালে সে ঘুমাতেই চায় না। কিন্তু রোজ রোজ নতুন গল্প কোথায় পাওয়া যায়! উপায় না দেখে বড় বোন মনের মাধুরী মিশিয়ে মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করে। সেই বড় বোনটি আজ পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় গল্পকার—হ্যারি পটারের লেখক জে কে রাউলিং। ছোটবেলায় আর ১০ জন ছেলেমেয়ের মতো খেলাধুলার প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না রাউলিংয়ের। ভারি লাজুকধরনের মেয়ে ছিলেন তিনি, চুপচাপ বসে বসে পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি চলে যান লন্ডনে। সেখানে গিয়ে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, সেক্রেটারি হওয়া তাঁর কাজ নয়, তিনি নাকি প্রচণ্ড অগোছাল আর অমনোযোগী! হবেই বা না কেন, মিটিংয়ের সময় যখন চটপট নোট নেওয়ার কথা, তখন যে তাঁর মাথায় নতুন গল্পের আইডিয়া খেলে বেড়ায়। সেক্রেটারি হওয়ার আশা ছেড়ে তিনি ঠিক করেন ইংরেজির শিক্ষক হবেন। ইংল্যান্ড ছেড়ে পর্তুগালে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক পর্তুগিজ সাংবাদিকের। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করেন তাঁরা, সন্তানও হয় তাঁদের। কিন্তু মেয়ের জন্মের চার মাসের মাথাতেই রাউলিং ও তাঁর স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাউলিং দেশে ফিরে আসেন। শুরু হয় রাউলিংয়ের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায়। সংসার ভেঙে গেছে, কোলে ছোট্ট মেয়ে, একটি চাকরি পর্যন্ত নেই। সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে মা-মেয়ের বেঁচে থাকা। তীব্র অনিশ্চয়তায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে সেই ভয়াবহ হতাশার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি আত্মহত্যা করার কথাও ভেবেছিলাম। শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে পেরে উঠিনি। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমি নিজেকে সামলে নিই। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার নিজের এই অবস্থা হলে মেয়েকে মানুষ করতে পারব না। অতঃপর নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বদলে আমি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, নয় মাস ধরে একজন কাউন্সিলরের কাছে চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে।’ স্কটল্যান্ডের এডিনবরার এক ক্যাফেতে বসে তিনি একটু একটু করে লেখালেখি শুরু করেন। বহুদিন আগে ম্যানচেস্টার থেকে ট্রেনে লন্ডনে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় একটি গল্পের চিন্তা এসেছিল—এক ছোট্ট ছেলের কাহিনি, যে ট্রেনে চড়ে জাদুকরদের এক স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে। সেই ছেলে আর কেউ নয়, হ্যারি পটার। ১৯৯৫ সালে রাউলিং হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার’স স্টোন বইটি লেখা শেষ করেন আর কয়েকজন এজেন্টকে বইয়ের পাণ্ডুলিপি পাঠান। মজার বিষয় হলো, শুরুতে কোনো প্রকাশক বইটি ছাপতেই রাজি হয়নি। বড় বড় অনেক প্রকাশক পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। টানা এক বছর ধরে চেষ্টার পর একজন প্রকাশক পাওয়া যায়। তা-ও সম্ভব হয়েছিল সেই প্রকাশকের আট বছর বয়সী মেয়ের কারণে, যে বইটি দারুণ পছন্দ করেছিল। বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অগ্রিম সম্মানী হিসেবে রাউলিংকে দেড় হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়। প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল মাত্র এক হাজার কপি, যার মধ্যে ৫০০ কপিই বিক্রি করা হয়েছিল বিভিন্ন স্কুলের লাইব্রেরির কাছে। হ্যারি পটারের প্রথম সংস্করণের সেই বইগুলো আজ পৃথিবীজুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে এক অমূল্য, দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়, আর প্রতিটি বইয়ের বর্তমান দাম বেশি নয়, মাত্র ২৫ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা)। ১৯৯৮ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে রাউলিং তাঁর প্রথম দুটি বইয়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্ব বিক্রি করে দেন, এরপর আর কখনো অর্থাভাবে পড়তে হয়নি তাঁকে। হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলো একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করে। প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অব ফায়ার বইটি প্রকাশ হওয়ার প্রথম দিনেই যুক্তরাজ্যে বিক্রি হয় প্রায় তিন লাখ কপি, আর দুদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয় ৩০ লাখ কপিরও বেশি! সাফল্যের শিখরে উঠলেও নিজের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর স্মৃতি ভুলে যাননি রাউলিং। ২০০০ সালে তিনি একটি দাতব্য ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যা দুস্থ নারী ও শিশুদের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ডের মতো সহায়তা প্রদান করে থাকে। তথ্যসূত্র: ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ যুক্তরাজ্যভিত্তিক পত্রিকা ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন অঞ্জলি সরকার একসঙ্গে একাধিক কাজ নয়: অ্যারিয়ানা হাফিংটন গ্রিক-আমেরিকান লেখক ও কলামিস্ট অ্যারিয়ানা হাফিংটনের জন্ম ১৯৫০ সালের ১৫ জুলাই। অ্যারিয়ানা অনলাইন নিউজপোর্টাল হাফিংটন পোস্ট-এর সম্পাদক। তিনি ২০১৩ সালে স্মিথ কলেজের সমাবর্তনে এই বক্তব্য দেন। অভিনন্দন তোমাদের সবাইকে। সমাবর্তন বক্তাদের কাছ থেকে সবাই ‘সফল হওয়ার সহজ উপায়’-জাতীয় কিছু উপদেশ আশা করে। কিন্তু তার বদলে আমি চাইব সাফল্যের সম্পূর্ণ ধারণাটিকেই তোমরা ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করো। আজকের পৃথিবীতে এটিই প্রয়োজন। শুধু শীর্ষ স্থান দখল করে বসে থাকলে হবে না, যেখানে আছো, সে স্থানটিকে বদলে দাও, পৃথিবীকে বদলে দাও। আমাদের সমাজে সাফল্য বলতে প্রধানত দুটো জিনিসকেই বোঝানো হয়: অর্থ ও ক্ষমতা। এমনকি সাফল্য, অর্থ ও ক্ষমতা—এই তিনটি শব্দ আজকাল প্রায় সমার্থক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অর্থ ও ক্ষমতার বাইরেও আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে। আমরা এমন সাফল্য চাইব, যার মধ্যে থাকবে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, জ্ঞান ও বিবেক, জীবনের প্রতি কৌতূহল ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা। শুধু অর্থ আর ক্ষমতা দুই পায়ের একটি টুলের মতো, এর ওপর ক্ষণিকের জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা যায় কিন্তু একসময় তুমি ঠিকই উল্টে পড়বে। অসংখ্য সফল মানুষ এভাবেই উল্টে পড়েছেন, এখনো পড়ছেন। সাফল্যকে আমরা যেভাবে এত দিন ব্যাখ্যা করে এসেছি, তা আর গ্রহণযোগ্য নয়। সময় এসেছে জীবনকে নতুন চোখে দেখার। সফল হওয়ার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের যতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তার পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলছে। নারীদের জন্য এই মূল্য আরও বেশি। যেসব নারী কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন, তাঁদের হূৎপিণ্ডের সমস্যায় ভোগার আশঙ্কা শতকরা ৪০ ভাগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা শতকরা ৬০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এ শতাব্দীর কর্মজীবীরা, মানে তোমাদের মতো এত চাপ অতীতের কোনো প্রজন্মই মোকাবিলা করেনি। এই মুহূর্তে আমেরিকার অফিসগুলো কাজের চাপে বিধ্বস্ত, নির্ঘুম রাত কাটানো মানুষদের দিয়ে চলছে। ২০০৭ সালে আমার অবস্থাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। নিদ্রাহীন, পরিশ্রান্ত শরীরে আমি ডেস্কের ওপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মাথায় আঘাত লেগেছিল, গালের হাড় ভেঙে গিয়েছিল, ডান চোখের ওপর চারটা সেলাই দিতে হয়েছিল। নিদ্রাহীনতা যে শুধু শরীরের ক্ষতি করে তা নয়, এর ফলে তোমার সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা—সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে। নিউইয়র্কে হাফিংটন পোস্ট-এর অফিসে দুটো রুম আছে শুধু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম আমাদের সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকৌশলীদের কেউই রুমগুলো ব্যবহার করতে চাইতেন না। তাঁরা ভাবতেন অন্যরা মনে করবেন কাজ ফাঁকি দিয়ে অফিসে এসে ঘুমানো হচ্ছে! অতঃপর আমরা অফিসের পরিবেশটা এমনভাবে বদলে ফেলেছি, যাতে বিশ্রাম নেওয়া নয়, বরং বিধ্বস্ত শরীরে হেঁটে বেড়ানোকেই বাঁকা চোখে দেখা হয়। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই যে এখন রুম দুটো খালি পাওয়াই মুশকিল! সাফল্যের সংজ্ঞায় সুস্থতাকে যোগ করার অর্থ হলো, জীবনে আর্থিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানুষ হিসেবে আমাদের মানবিক চাহিদাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া। আমার মা এই কাজটি খুব ভালো পারতেন। আমার বয়স যখন ১২, একদিন অত্যন্ত সফল এক ব্যবসায়ী আমাদের বাসায় ডিনারে এসেছিলেন। তাঁকে ভারি ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল। যখন আমরা খেতে বসলাম তখন তিনি ক্রমাগত বলতে থাকলেন তাঁর ব্যবসায় কত লাভ করছে, কী দারুণ চলছে সবকিছু। কিন্তু মা তাতে ভোলার পাত্রী ছিলেন না। তিনি সোজাসুজি বলেছিলেন, ‘আপনার ব্যবসা কত ভালো করছে তাতে কিছুই আসে-যায় না, যখন আপনি নিজেই ভালো নেই। আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আপনি নিজেই। আপনার স্বাস্থ্যের অ্যাকাউন্ট থেকে আপনি শুধু চেক তুলেই যাচ্ছেন। যদি শিগগিরই সেখানে কিছু জমা না করেন তবে দেউলিয়া হতে আর বেশি দিন বাকি নেই।’ কিছুদিন পরই সেই ব্যবসায়ীকে একটি বড় অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সুস্থতার প্রতি মনোযোগ দিলে আরও একটি চমৎকার ব্যাপার ঘটবে। ভেবে দেখো তো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিছুই করা হয়ে উঠছে না—এমন চিন্তা কখনো মাথায় আসে কি না? সব সময়ই আসে, তাই না? যখনই ঘড়ির দিকে তাকাও, দেখবে যা ভেবেছিলে তার চেয়ে বেশি বাজে। সমস্যা হচ্ছে, যতক্ষণ আমরা দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অর্থ আর ক্ষমতার পেছনে ছুটতে থাকব, জীবনের অন্য দিকগুলো দেখেও দেখা হবে না। আমরা কৌতূহলী হতে ভুলে যাব। আমার মাকে দেখেছি সারাক্ষণ কৌতূহলী চোখে জীবনকে উপভোগ করছেন, তিনি রান্নাঘরে বাসন ধোয়ার সময়ই হোক আর সাগরপারে শঙ্খচিলদের খাওয়ানোর সময়ই হোক। জীবনের ছোট ছোট জিনিস থেকে শুরু করে এই মহাবিশ্বের নানা রহস্য—সবকিছুই তাঁকে সমানভাবে মোহিত করে রাখত। আমি যখন কোনো ব্যাপার নিয়ে অভিযোগ করতাম বা মন খারাপ করে থাকতাম, মা বারবার আমাকে একটি উপদেশ দিতেন; বলতেন, ‘মামণি, চ্যানেলটা বদলে দাও। রিমোট তো তোমার নিজের হাতেই। ভয়ের ছবি আবার দেখার কী দরকার।’ পৃথিবীজুড়ে, রাজনীতি, ব্যবসা, মিডিয়া—সব ক্ষেত্রেই আমরা অনেক বুদ্ধিমান নেতৃত্বের দেখা পাই, যাঁরা কিছু জঘন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তার কোনো ঘাটতি নেই, বরং তাঁদের জ্ঞান ও বিবেকের অভাব রয়েছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আজকাল আমরা সবাই আমাদের অন্তর্নিহিত সত্তার সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় হারাতে বসেছি। আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে অগুনতি যন্ত্র, চোখ আটকে আছে একাধিক স্ক্রিনে, সামাজিক জীবন বন্দী হয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়—এত কিছুর মায়া ছাড়িয়ে নিজেদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন আজ সত্যি কঠিন। আবার ফিরে আসি মায়ের গল্পে। মারা যাওয়ার আগে শেষবার মা আমার সঙ্গে রাগ করেছিলেন, যখন আমি একই সঙ্গে ই-মেইল পড়ছিলাম আর আমার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। মা রেগে বলেছিলেন, ‘আমি একসঙ্গে একের বেশি কাজ করা দুই চোখে দেখতে পারি না।’ সত্যিই তো, সারা পৃথিবীর সবকিছুর সঙ্গে ভাসা ভাসাভাবে যুক্ত থাকতে গিয়ে আমরা সবচেয়ে আপনজনদের কাছ থেকে হারিয়ে যাই, এমনকি নিজের কাছ থেকেও। আমি বলছি না প্রযুক্তি থেকে নিজেদের একদম বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। কিন্তু নিয়মিত, প্রয়োজন অনুসারে আমাদের যান্ত্রিকতাকে সরিয়ে রেখে নিজেদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। শুধু তার লাগিয়ে আমাদের যন্ত্রগুলোকে রিচার্জ করলে হবে না, তার খুলে রেখে আমাদের নিজেদেরও মানসিকভাবে রিচার্জ করে নিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সব মানুষের ভেতরই জ্ঞান ও শক্তির একটি পুঞ্জীভূত সাম্যাবস্থা বিরাজ করে। পৃথিবীর সব ধর্মই বলে যে ঈশ্বরের অবস্থান মানুষের হূদয়ে—সে ইসলাম, খ্রিষ্ট, বৌদ্ধ বা অন্য যে আদর্শের অনুসারীই হোক না কেন। আমরা অন্তরের সেই অন্তস্তল থেকে প্রায়ই দূরে সরে যাই, জীবন এমনই। কিন্তু যখন আমরা সেই সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে পারি, তা জীবনকে আগাগোড়া বদলে দেয়। বাধা-বিপত্তি-হতাশা যা-ই আসুক না কেন, আমাদের বিশ্বাস ফিরে আসে। জীবনের মানে তখনই বোঝা যায়, যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই। সবচেয়ে দুঃখের স্মৃতিগুলোও তখন অর্থবহ হয়ে ওঠে। তাই এটা মনে করাই ভালো যে যা ঘটছে, আমাদের ভালোর জন্যই ঘটছে। আজ এই সুন্দর ক্যাম্পাস ছেড়ে যখন তোমরা নিজেদের স্বপ্ন সত্যি করার যাত্রা শুরু করছ, তখন তোমাদের কাছে আমার একটিই অনুরোধ, সমাজের চোখে যা সাফল্য, সেই মরীচিকার পেছনে ছুটো না। এই তথাকথিত সাফল্য লাভের ফর্মুলা কারও জন্যই কাজ করছে না। এমন সাফল্য নারীর জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়, পুরুষের জন্য নয়, এমনকি উত্তর মেরুর শ্বেতভালুকদের জন্যও এসব কোনো উপকারে আসবে না, এ আমি দিব্যি বলতে পারি! শুধু তাদেরই উপকারে আসবে, যারা ডায়াবেটিস, হূদরোগ, অনিদ্রা আর রক্তচাপের জন্য ওষুধ বানাচ্ছেন। তাই অন্তঃসারশূন্য কোনো করপোরেট ব্যবস্থার বা রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েই আত্মতৃপ্তিতে ডুবে যেয়ো না। সমস্যার গভীরে প্রবেশ করো, সমাধানের পথ খুঁজে দেখো। জীবনের আসলে কিসের মূল্য আছে আর কী করলে সফল হওয়া যায়, সেই ধারণাগুলোকে বদলে দাও। মনে রেখো, কত টাকা উপার্জন করলে আর কত ওপরে উঠতে পারলে, এসব ব্যাপার তোমাকে অসংখ্যবার অসংখ্য মানুষ মনে করিয়ে দেবে, কিন্তু নিজের কাছে নিজে সৎ থাকলে কি না, নিজের যত্ন নিলে কি না, জীবনকে উপভোগ করতে পারলে কি না এসব কেউ তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে আসবে না। নিজের হূদয়ের সঙ্গে তোমার নিজের চেষ্টাতেই যুক্ত থাকতে হবে; যেখান থেকে সবকিছু সম্ভব হয়। আর সেখান থেকেই তুমি পারবে পৃথিবীকে বদলে দিতে, এমন পৃথিবী গড়তে, যেখানে নারী-পুরুষনির্বিশেষে আমরা সবাই ভালো থাকতে পারি, ভালোবাসতে পারি। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার কখনো একইভাবে দুবার হারবে না: চাক নরিস চাক নরিস (জন্ম: মার্চ ১০, ১৯৪০) বিখ্যাত আমেরিকান মার্শাল আর্টিস্ট ও অভিনেতা। ২০০৮ সালে লিবার্টি ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে চাক নরিস যে বক্তৃতা দেন, এটি তার সংক্ষেপিত ভাষান্তর। তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, আজকের সুন্দর সকালে আমাকে তোমাদের সামনে কিছু বলতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমি স্বীকার করি, এই কাজটা আমি একদমই করতে পারি না। এটাই আমার প্রথম সমাবর্তন বক্তৃতা। জীবনে সৃষ্টিকর্তা সব সময়ই আমাকে সাহায্য করে গেছেন, পথ দেখিয়েছেন। আমার জন্ম ওকলোহামাতে। বলতে বাধা নেই, আমার পরিবারে অনেক অভাব ছিল; কিন্তু আমার মা ছিলেন অসাধারণ একজন নারী। আর আমার বাবা ছিলেন একজন মদ্যপ, তিনি বলতে গেলে আমার জীবনে কোনো ভূমিকাই রাখেননি। ছোটবেলায় আমি অনেক লাজুক ও আত্মমুখী ছিলাম; খেলাধুলাও তেমন করতাম না। আমি কখনো স্কুলে আমার ক্লাসে সবার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে পারিনি। যখনই শিক্ষক আমাকে কিছু বলার জন্য ডাকতেন, আমি আমার নিজের সিটে বসে মাথা ঝাঁকাতাম। কারণ, আমি ভয় পেতাম, আমি কথা বললে সবাই হাসবে। যদিও আমার বসে থাকা দেখে অনেকে হাসত এবং এতে লজ্জায় আমার চেহারা লাল হয়ে যেত। হাই স্কুল পাস করে আমি বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে কোরিয়া চলে গেলাম এবং সেখানেই মার্শাল আর্ট বিষয়টার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। ১৯৬১ সালে যখন আমি সেখান থেকে ফিরে আসি, আমার সঙ্গে ছিল তায়েকোয়ান্ডোর ব্ল্যাক বেল্ট ও জুডোর ব্রাউন বেল্ট। তখন আমেরিকার খুব বেশি লোক মার্শাল আর্ট সম্পর্কে জানত না। আমি একটি মার্শাল আর্ট ক্লাব খুললাম এবং সবাইকে আমন্ত্রণ জানালাম। আমি ভাবলাম, আমাকে নিশ্চয় আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের সামনে কিছু বলতে হবে। আমি আধা পৃষ্ঠার একটি বক্তৃতা তৈরি করলাম এবং সাত দিন সেটা মুখস্থ করলাম। সেটা আমি এত ভালো মুখস্থ করেছিলাম যে উলটো দিক থেকেও তা বলতে পারতাম। আমি ৫০০ জন আমন্ত্রিত অতিথির মাঝখানে হেঁটে গেলাম, আর বললাম, ‘শুভসন্ধ্যা। আমার নাম চাক নরিস এবং আমি আপনাদের এখানে অভিবাদন জানাচ্ছি’—এটাই ছিল শেষ বাক্য, যেটা আমার মনে আছে। এরপরের যে স্মৃতি আমার মনে আছে, সেটা হলো অতিথিদের মাঝখান থেকে চলে আসার এবং কিছু কায়দা দেখানোর স্মৃতি। আমি এখনো জানি না, সেদিন আমি অতিথিদের সামনে কী বলেছিলাম। আমি যে কাজটা করেছিলাম, সেটা ছিল ২১ বছর ধরে যে অবিশ্বাস নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, সেটাকে ভেঙে ফেলা। আমি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর লস অ্যাঞ্জেলসে প্রথম মার্শাল আর্ট স্কুল খুললাম। মার্শাল আর্টের মূল যে শিক্ষাটি আমি পেয়েছি সেটা হলো, একজন তখনই হারে, যখন সে পরাজয়ের অভিজ্ঞতাটি থেকে কোনো শিক্ষা পায় না। তাই আমি আমার ছাত্রদের শেখাই, তোমরা হারতে পারো, কিন্তু কখনো একইভাবে দুবার হারবে না। আমার স্কুল ভালোই চলছিল, এ সময় একটি কোম্পানি এসে আমার স্কুলের স্বত্ব কিনে নিতে চাইল। তখন আমার তিনটি স্কুল ছিল। কোম্পানিটি আমাকে জানায়, তারা সারা দেশে ‘চাক নরিস মার্শাল আর্ট স্কুল’ খুলতে চায়। আমি ভাবলাম, ভালোই তো। আমি আমার স্কুলকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেব। এর দুই বছর পরে সেই কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং আমি আমার সব কটি স্কুল হারাই। আমি কিন্তু থেমে যাইনি। নতুন করে কিকস্টার্ট নামে একটি ফাউন্ডেশন চালু করলাম। ১৫ বছর ধরে আমি হাজারো তরুণের মধ্যে মার্শাল আর্টের দর্শনকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছি। আমেরিকার লাখো মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের বাণিজ্যিক মার্শাল আর্ট স্কুলে পাঠাতে পারেন না। আমি ভেবেছি, কীভাবে তাঁদের সাহায্য করতে পারি। আমি ঠিক করলাম, প্রতি শহরের মিডল স্কুলগুলোতে বিনা মূল্যে আমি মার্শাল আর্ট শেখাব, যার ব্যয়ভার নেবে আমার ফাউন্ডেশন। এটা ছিল ১০ বছর আগের কথা। এর মধ্যে আমাদের স্কুল থেকে এক লাখ ৫০ হাজার তরুণ মার্শাল আর্ট শিক্ষা নিয়েছে। কিন্তু একজন ছেলের কথা আমি বিশেষ করে বলতে চাই, যে ছিল আমাদের জন্য সাফল্যের একটি বড় প্রেরণা। আমরা স্কুলে মূলত ষষ্ঠ,সপ্তম, অষ্টম মানের শিশুদের শিক্ষা দিই। কারণ, এ সময়েই শিশুরা সবচেয়ে দ্রুত শেখে। আমাদের লক্ষ্য থাকে, যাতে তারা এ সময়ে সঠিক পথ থেকে সরে না যায় এবং জীবনের লক্ষ্য ঠিক রাখে। কিন্তু আমাদের সেই ছেলেটি এই সময়ে একটি সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ছেলেটি ষষ্ঠ মানে পায় ‘ডি’ গ্রেড এবং তখন বাইরের দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু মার্শাল আর্ট শুরু করার পরে তার চরিত্র পাল্টে যেতে থাকে এবং বাস্তবিকই সে ভালোর পথে আসে। সে তার অন্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে এবং তার পড়ালেখাতেও উন্নতি করতে থাকে। সপ্তম মানে তার গ্রেড আসে ‘সি’ এবং অষ্টম মানে এসে সে পায় ‘বি’ গ্রেড। মার্শাল আর্ট তার মনজগৎকে বদলে দেয় এবং ছেলেটি নবম থেকে ১২শ মান পর্যন্ত টানা ‘এ’ গ্রেড পেয়ে এমআইটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। মার্শাল আর্ট আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছে। আমি মনে করি, এটা আরও অনেক তরুণের জীবন গড়ে দিতে সক্ষম। সৃষ্টিকর্তা আমাকে সব সময় সঠিক পথ দেখিয়েছেন। তোমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস আনো আর পরিশ্রম করে যাও, জীবনের সবকিছু ভালোভাবেই এগোবে। তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। সূত্র: ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: মনীষ দাশ সাফল্যের সূত্র নিজের হাতেই: রাহুল দ্রাবিড় ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়ের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১১ জানুয়ারি। তিনি টেস্ট ক্রিকেটে ৩৬টি সেঞ্চুরিসহ ১৩,২৮৮ রান ও ওয়ানডেতে ১২টি সেঞ্চুরিসহ ১০,৮৮৯ রানের মালিক। ক্রিকেটার হিসেবে অসামান্য এই অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পদ্মভূষণ ও স্যার ব্র্যাডম্যান অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট ভারতের গোয়ায় অবস্থিত বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের (বিআইএসটি) সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এই বক্তব্য দেন। তোমাদের সঙ্গে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। বিআইটিএস নিঃসন্দেহে ভারতের অন্যতম সেরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অগ্রযাত্রায় এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। এখানে পড়তে চাইলে একজন শিক্ষার্থীকে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে সর্বনিম্ন ৭৫ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। কিন্তু আমি অনেক ভাগ্যবান কারণ, সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মেনে চলা হয় না! আমার অবসরের পরের সময়টি ছিল আত্ম-অনুসন্ধান ও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার জন্য সুন্দর একটি সময়। এ সময়ে আমি আবিষ্কার করেছি যে ক্রিকেট আমাকে আরও পরিণত করেছে, মানুষ হিসেবে যোগ্যতর বানিয়েছে। এর মাধ্যমেই আমি সুযোগ পেয়েছি সাফল্য ও ব্যর্থতাকে খুব কাছ থেকে দেখার, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং জীবনের অংশ হিসেবে এগুলোকে মানিয়ে নেওয়ার। আমাকে প্রায়ই অনুরোধ করা হয়, জীবনে সফল কীভাবে হতে হয়, তা ব্যাখ্যা করার জন্য। সত্য কথাটি হলো, সফল হওয়ার হাজারো সমীকরণ রয়েছে, কিন্তু নিজেদেরই আমাদের সমীকরণ মিলিয়ে নিতে হবে। অন্য একজন কখনোই বলতে পারে না, তুমি কীভাবে সফল হবে? সেটা তোমার নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। তোমাদের সামনে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি চাই আমার নিজের জীবনের কিছু গল্প তোমাদের জানাতে, যাতে তোমরা বুঝতে পারো, আমার পথচলাটা কেমন ছিল। আমি তোমাদের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা বালকের গল্প বলতে চাই, যে বালকটি ছিলাম আমি। আমার বাবা ছিলেন একজন ক্রিকেট-পাগল মানুষ, তিনি প্রতিটি ম্যাচ রেডিওতে শুনতেন, তা ভারতের হোক বা অন্য কোনো দলের। যখনই তিনি সুযোগ পেতেন, আমাকে ও আমার ভাইকে নিয়ে মাঠে খেলা দেখতে যেতেন। তাঁর কাছে এটাই ছিল সময়ের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার। বাবাই ছিলেন আমার ছোটবেলার নায়ক। তাঁকে দেখে দেখেই আমার ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো। তাঁর সঙ্গে খেলা দেখতে দেখতে, বাড়ির উঠানে, পাড়ার রাস্তায় খেলতে খেলতে সেই আগ্রহটা আরও বাড়তে থাকল। এই আগ্রহটাই একদিন ভালোবাসায় বদলে গেল। আবিষ্কার করলাম, আমি কী হতে চাই? আমি বুঝতে পারলাম, দ্রাবিড় পরিবারে জন্ম নেওয়াটা কোনো নিছক ঘটনা নয়, এটাই আমার জীবনের অনুপ্রেরণা। স্কুলজীবন থেকেই আমার জগৎটা ছিল ক্রিকেটকেন্দ্রিক। যখন আমি আন্তস্কুল টুর্নামেন্ট জিতলাম, আমি ভাবলাম বিশ্বকাপ জিতে গেছি! তখন আমার সবচেয়ে বড় মিশন ছিল স্কুল ও রাজ্য দলকে নেতৃত্ব দেওয়া। অন্য সব মা-বাবার মতো আমার মা-বাবাও আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তাঁরা ভাবতেন, আমি যদি শুধু ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকি, তাহলে আমার অন্য সব বিষয়ের কী হবে? যখন আমি অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী, তাঁরা আমাকে নিয়ে স্কুল অধ্যক্ষের কাছে গেলেন। আমি তখন অনূর্ধ্ব ১৫ রাজ্য দলের জন্য নির্বাচিত হয়েছি; কিন্তু টুর্নামেন্টটি ছিল আরেকটি রাজ্যে এবং সে সময় আমার স্কুলের ক্লাস চলতে থাকবে। তাঁরা অনেক দ্বিধায় ছিলেন, কারণ ক্রিকেটের কারণে আমার স্কুলের পড়ালেখার অনেক ক্ষতি হচ্ছিল এবং তাঁরা চাইছিলেন না আমি এই টুর্নামেন্ট খেলতে যাই। কিন্তু ফাদার কোয়েলহো তাঁদের বোঝালেন এবং বললেন, ‘ওর পড়ালেখার দায়িত্ব আমার। আপনারা শুধু ওকে ক্রিকেট খেলতে দিন।’ যদি অধ্যক্ষ আমার মা-বাবার কথায় রাজি হতেন, তাহলে আমি হয়তো ক্রিকেট নিয়ে আর কখনো সেভাবে ভাবতাম না, হয়তো আমার জীবনের গল্পটা অন্যভাবে লেখা হতো। জীবন থেকে আমি এই শিক্ষা পেয়েছি, কখনো কখনো খুব অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে সাহায্য আসে এবং সেগুলোই জীবনের বড় বড় পরিবর্তন আনে। বন্ধুদের কাছ থেকে ক্লাস নোট ধার নিয়ে এবং স্কুল ও কলেজজীবনে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আমি ক্রিকেটার হওয়ার পথে হেঁটেছি। সে সময় আমাকে প্রচুর লিগের খেলা খেলতে হতো, যার অনেকগুলোই হতো বাউন্সি উইকেটে। সারা দেশে আমি ট্রেনে করে ঘুরেছি, কখনো কখনো ছোট এক রুমে পাঁচ থেকে ছয়জন করে রাতে থেকেছি। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এভাবেই আমি আমার দেশকে চিনেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। শুরুতে আমাদের আন্তর্জাতিক মানের ফাস্ট বল খেলার সে রকম কোনো সুযোগ ছিল না। আমি নিজের মতো করে একটি প্র্যাকটিস-পদ্ধতি মেনে চলতাম, টিমমেটদের আমি বলতাম, ৪৫ ফুট (১৫ ইয়ার্ড) দূর থেকে ভেজা টেনিস বল ছুড়ে মারতে, যাতে আমি বুঝতে পারি যে একজন বিশ্ব মানের পেসারকে খেলতে কেমন লাগে। অনেকে আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাত, অনেকে মনে করত, এটা শুধুই সময়ের অপচয়। কিন্তু, এটাই ছিল আমার করা সবচেয়ে দরকারি প্র্যাকটিস। এর মধ্যে আমার জাতীয় দলে খেলার সম্ভাবনা দেখা দিল, এমনকি আমি ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলকেও নেতৃত্ব দিলাম। দেখা হলে সবাই আমাকে জিজ্ঞাসা করত, কখন তুমি জাতীয় দলের হয়ে খেলছ? কিন্তু এ ব্যাপারটি তো আসলে আমার হাতে ছিল না; ফলে আমার জীবন ও খেলার ওপরে এর প্রভাব পড়তে শুরু করল। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগে আমি ঘরোয়া লিগে পাঁচ বছর খেলেছি। সে সময়টি ছিল আসলেই অনেক হতাশার। আমার মনে পড়ে, আমি আমার বাইকের ওপরে একটা স্টিকার লাগিয়েছিলাম, যাতে লেখা ছিল, ‘গড’স ডিলেস আর নট গড’স ডিনায়ালস’। পেছন ফিরে তাকালে আমি বুঝতে পারি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার সাফল্য আসলে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতীক্ষারই ফসল। রঞ্জি ট্রফিতে দক্ষ স্পিনারদের খেলেই আমি ওয়ার্ন ও মুরালিধরনকে খেলার আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। টেনিস বল নিয়ে করা প্র্যাকটিস থেকেই আমি বুঝতে পেরেছি, কী করে খারাপ উইকেটে ম্যাকগ্রা, আকরাম, ডোনাল্ডদের মতো পেসারদের খেলতে হয়। যখন আমি তরুণদের সঙ্গে কথা বলি, জীবনের এই গল্পটা আমি সব সময়ই তাঁদের শোনাই। আমি আমার ক্যারিয়ারের চড়াই-উতরাইগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট। আমি আমার স্বপ্নের পাহাড়ে চড়েছি, যে স্বপ্ন আমি একটি ছোট বালকের চোখ দিয়ে দেখেছিলাম। সেই পাহাড়ে চড়াটাই ছিল আমার জীবনের সবকিছু এবং আমি যতই চূড়ার কাছে যাচ্ছিলাম, আমার লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পেরেছি। যখন আমি পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছলাম, আমি সময়টাকে উপভোগ করেছি এবং গভীর আনন্দ পেয়েছি। কারণ, সে সময়ই আমি উপলব্ধি করেছি, শান্তি লাভের জন্য আমাকে বিশ্বের এক নম্বর হওয়ার প্রয়োজন নেই, আমাকে শুধু নিজের কাছে এক নম্বর হতে হবে। একজন ভালো পর্বতারোহীর মতো, আমি এখনো নতুন আরেকটি পাহাড়ে চড়ার স্বপ্ন দেখছি। জীবনের অনিশ্চয়তা আমাকে চিন্তিত করে তোলে, আবার আনন্দও দেয়। মাঝেমধ্যে আমি আমার শৈশবে ফিরে যাই, বাবার ট্রানজিস্টরে শোনা ক্রিকেটের ধারাভাষ্য এখনও কানে বাজে। ২০১৩ সালের সমাবর্তন ক্লাস, তোমাদের সবাইকে আমার হূদয়ের উষ্ণ শুভেচ্ছা। আমি প্রার্থনা করি, যাতে তোমরা চড়ার জন্য নিজেদের স্বপ্নের পাহাড় খুঁজে পাও। চলার পথে একে অন্যকে সাহায্য করো, বিপদে ধৈর্যশীল হও, জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতাকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার শক্তি অর্জন করো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো জীবনের পথচলার প্রতি মুহূর্ত উপভোগ করো। ভালো থেকো। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: মনীষ দাশ সব বিষয়ে অভিজ্ঞতা নাও পাওলো কোয়েলোর জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে৷ দ্য অ্যালকেমিস্ট তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস, যা পৃথিবীর ৬৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী দেড় কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে৷ কৈশোরেই আমি লেখালেখি শুরু করি৷ আমার মা আমাকে বলেছিলেন, ব্রাজিলের মতো দেশে লেখালেখি করে কেউ জীবিকা অর্জন করতে পারেন না৷ আমি তা বিশ্বাস করে অন্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এমন কিছু খুঁজে পাইনি, যেটা আমাকে আনন্দ দিতে পারে৷ ফলে আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলাম এবং হিপ্পি সেজে দেশ ভ্রমণ শুরু করলাম৷ কিছুদিন পর আবার ব্রাজিলে ফিরে এসে একটা ম্যাগাজিন চালু ক​রি৷ এরপর একসময় গানের জন্য কথা লেখার আমন্ত্রণ পেলাম এবং শেষে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হই৷ লেখালেখি করে আমি জীবিকা অর্জন করতে পারলাম, কিন্তু তখনো কোনো বই লিখিনি৷ যখন প্রথম বইটা লিখি, তখন আমার বয়স ৩৮ বছর৷ এত দেরি হওয়ার কারণ, আমি বিশ্বাস করতাম, কারও স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার কারণ হতে পারে দুটি৷ প্রথমত, মনে করা যে স্বপ্ন পূরণ হওয়া সম্ভব নয়; দ্বিতীয়, বুঝতে পারা যে এটা হওয়া খুব সহজেই সম্ভব৷ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মানুষ নিজের জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলে৷ আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় সান্তিয়াগো ডি কম্পোস্টেলায় তীর্থযাত্রা৷ সে সময় আমি ঠিক করি, আমার জীবনের লক্ষ্য হবে মহাবিশ্বের রহস্যগুলোর সন্ধান করা এবং বুঝতে পারি যে এখানে আসলে কোনো রহস্যই নেই-জীবন সব সময়ই একট​া ধাঁধা হয়ে থাকবে৷ আমাদের উচিত, প্রকৃতির সংকেতগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা এবং অন্যদের কথা শোনা৷ প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকাটা একটা বিস্ময় এবং আমরা যখন অন্য মানুষের মুখোমুখি হই, সেটা বুঝতে পারি৷ এই তীর্থযাত্রার পর আমি আমার আধ্যাত্মিক পথযাত্রাকে সরল করে তুলি এবং জীবনের নানা জটিল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বন্ধ করি৷ কারণ, তখন উপলব্ধি করতে শিখেছি যে জীবন নিজেই সব প্রশ্নের সবচেয়ে বড় উত্তর৷ লেখালেখি খুবই নিঃসঙ্গ একটা কাজ৷ যখন একটা বই লিখি, আমি আত্মার মুখোমুখি দাঁড়াই৷ এতে নিজের মধ্যে এমন সব রাস্তার খোঁজ পাই, যা কখনো ভাবিইনি যে এটা আমার মধ্যে আছে৷ একটা বই লিখে শেষ করার পর অনুভব করি, আমি নিজের আলাদা একটা সত্তার জন্ম দিয়েছি; এমন একটা জিনিস সৃষ্টি করেছি, যেটা আমার অনুভূতি ও কল্পনাকে পাঠকের চিন্তায় ও হৃদয়ে পৌঁছে দেবে৷ এটা সম্পূর্ণ একটি জাদুকরি অনুভূতি৷ আমি লেখার মাধ্যমে চেষ্টা করি মনের প্রশ্ন ও সন্দেহগুলোকে তুলে ধরতে৷ আমার কাছে দর্শন জীবন্ত কোনো বস্তুর মতো৷ এমন কোনো বস্তু, যেটা আমাদের মনের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভোল পাল্টায়৷ আমার লেখনীতে সবাইকে জানাতে চাই, ‘নিজের স্বপ্নে বাঁচো, এর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে তৈরি হও, প্রকৃতির সংকেত বুঝতে শেখো, নিজের মানবিক দিকটাকে শক্তিশালী করো আর সবার শেষে নিজের ভিন্নতাকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরো৷’ আমার দুটো বই দ্য পিলগ্রিমেজ ও দ্য ভালকাইরি হলো ননফিকশন; আর বাকি গল্পগুলো সংকেত ও রূপক ব্যবহার করে লেখা আমার জীবনের নানা ঘটনার উপজীব্য৷ আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখক শুধু সেটাই লিখতে পারেন, যেটা তিনি নিজে উপলব্ধি করেছেন-হয় সেটা বাস্তবে কিংবা পরাবাস্তবে৷ জীবনে যাঁদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, তাঁদের প্রত্যেকেরই আমাদের জীবনে কোনো না কোনো ভূমিকা আছে৷ আমাদের মনের টানেই আমরা জীবনের লক্ষ্যের দিকে নিরন্তর ছুটে যাই৷ তাই, আমার লেখালেখির মূল অনুপ্রেরণা হলো নিজের নিয়তিকে পূর্ণতা দেওয়া৷ আমার কাছে আমার সব বই-ই ‘এ প্লাস’৷ এর কারণ, আমি সবটুকু প্রেরণা দিয়ে প্রতিটা বই লিখি৷ আমার কাছে নিজের চেয়ে আমার বইগুলো ভালো৷ লেখক হতে চাইলে একজনের প্রয়োজন হবে শৃঙ্খলা ও অনুপ্রেরণা, শক্তি ও দৃঢ় মানসিকতা, নিজের চেষ্টা ও স্রষ্টার করুণা৷ একজন লেখকের নিশ্চয়ই একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে, কিন্তু একজন ভালো লেখক নিজেকে তাঁর লক্ষ্যের পথে পরিচালিত হতে ছেড়ে দেবেন৷ আসলে সমাজে একজন লেখকের কাজ একজন বাগান-মালি কিংবা একজন ট্যাক্সিচালকের মতোই৷ আমরা শুধু আমাদের কাজকে ভালোবাসতে পারি, তাতে সবটুকু শ্রম ঢেলে দিতে পারি-মানুষ ও সমাজ এ থেকে আপনাতেই উপকৃত হবে৷ নবীন, যারা লেখক হতে চায়, তাদের জন্য আমার উপদেশ থাকবে, যত রকমভাবে পারো, অভিজ্ঞতা অর্জন করো; আমি এভাবেই শুরু করেছিলাম৷ মানুষ জানে না, একজন বেস্ট সেলিং রাইটার হওয়ার জন্য আমাকে কত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে৷ কতবার বাধার সম্মুখীন হয়েছি৷ আমার দ্বিতীয় বই দ্য অ্যালকেমিস্ট যখন প্রকাশিত হয়, তখন আমি এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম৷ বইট​া প্রথমে একটা স্বল্পপরিচিত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়৷ যদিও এর বিক্রি ভালোই হচ্ছিল, কিন্তু এক বছর পরই প্রকাশক বইটার স্বত্ব আমাকে ফিরিয়ে দিলেন এবং জানালেন যে তিনি স্টক মার্কেট থেকে এর চেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করতে পারেন৷ এতে আমি এতটাই হতাশ হয়ে পড়ি যে আমার স্ত্রীকে নিয়ে রিও ছেড়ে চলে যাই মজেভ মরুভূমিতে, ৪০ দিন নিঃসঙ্গবাস করি৷ আমি চেয়েছিলাম এই মনঃকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে৷ যখন ফিরে এলাম, নিজের মধ্যে লড়াই করার প্রেরণা খুঁজে পেলাম৷ আমার জীবন থেকে বুঝতে শিখেছি, জীবনে ভয় ও ক্ষত থাকা সত্ত্বেও আমাদের করণীয় হচ্ছে, স্বপ্নপূরণের জন্য লড়াই করা৷ বোর্হেতাঁর লেখায় বলেছেন, ‘সাহসী হওয়ার চেয়ে বড় পুণ্য আর নেই৷’ সাহসী হওয়া মানে এই নয় যে আমি ভয় পাই না; সাহসী হওয়া মানে এই যে আমি ভয়কে উপেক্ষা করেও এগিয়ে যেতে পারি৷ সূত্র: ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনীষ দাশ বর্তমান সময়কে কাজে লাগাও জেসিকা লেঞ্জ মার্কিন অভিনেত্রী। তাঁর ঝুলিতে আছে দুটি অস্কার, দুটি অ্যামি, পাঁচটি গোল্ডেন গ্লোবসহ অসংখ্য পুরস্কার। ২০০৮ সালের ২৩ মে নিউইয়র্কের সারা লরেন্স কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এই বক্তৃতা দেন। আজকের এই সুন্দর সকালে আমরা এখানে এসেছি তোমাদের সমাবর্তন উদ্যাপন করতে। সে সঙ্গে তোমাদের এত দিনের সব প্রাপ্তি, সফলতা, কিছু ব্যর্থতা, তোমাদের সাহস, দ্বন্দ্ব, আবেগ—সবকিছুই আজ আমরা উদ্যাপন করব। কারণ, তারুণ্যের এক নতুন জগতে তোমরা আজ প্রবেশ করতে চলেছ। অনন্ত সম্ভাবনার দুয়ারে তোমরা এখন দাঁড়িয়ে আছ। বিজ্ঞান, কলা অথবা মানবিক—যে ক্ষেত্রেই তোমরা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাক না কেন; তোমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা। মানুষের কল্যাণে কাজ করা, তাদের কষ্ট লাঘব করা, তাদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা, আনন্দ দেওয়া—এ কাজগুলোকেই তোমাদের অনুপ্রেরণা করে নেওয়া উচিত। তোমাদের এই নব উত্থান আমাকেও উদ্বেলিত করছে। উইলিয়াম ব্লেক তাঁর কবিতায় বলেছেন, ‘আমার আঙুল থেকে স্ফুলিঙ্গ ঝরছে, ভবিষ্যৎ পরিশ্রমের প্রত্যাশায়’। এই ভাব আজকে আমার প্রাণেও দোলা দিচ্ছে। আমরা বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত একটি পৃথিবীতে বাস করছি। কিন্তু তোমাদের কাঁধে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার অনেক চাপ। তোমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। হৃদয়ের গভীর থেকে তোমাদের চাইতে হবে, যাতে মানুষ শান্তিতে, সমতায়, ন্যায়ে বেঁচে থাকতে পারে। তোমাদের স্বপ্ন হতে হবে এমন, যাতে গোটা পৃথিবী তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। যে সময়ে আমরা বাস করছি, সেটি খুবই জটিল ও বিভ্রান্তিকর। অর্থময় কোনো সংস্কৃতি আমাদের পথ দেখাচ্ছে না; মিডিয়া, ফ্যাশন, বিনোদনের নামে আমাদের ওপর চলছে আগ্রাসন। অন্তঃসারশূন্য করপোরেট শক্তি আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। আমি তোমাদের বলব একে প্রত্যাখ্যান করতে। স্রোতে গা-ভাসিয়ে তোমরা জীবনটা পার করে দিও না। নিজেই নিজের সাফল্যের সংজ্ঞা তৈরি করো, অন্য কারও মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার করো না। অন্য কারও প্রত্যাশার চাপ কিংবা ব্যর্থতাকে নিজের নিয়তি বানিয়ে নিও না। তোমরা পৃথিবীর আশাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করো। তোমাদের মধ্যে সবকিছুই আছে, যেটা তোমাদের অমর করে তুলতে পারে। তোমাদের কল্পনাশক্তির প্রখরতা, স্বপ্নের তীব্র গতি, ভাষার নিষ্কলুষতা এবং তারুণ্য—এসব কিছু হারিয়ে যেতে দিও না। যদি কখনো অনুভব করো যে তুমি নিজের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছ, নিজের সব শুদ্ধসত্তা দিয়ে আবার বুঝতে শিখ, তুমি কে ছিলে? মনের গভীরে তুমি আসলে কে? যদি তোমরা আমার কাছে জানতে চাও, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কোনটি? আমি বলব, সেটি হলো বর্তমানে বাস করা, এর প্রতিটি ক্ষণ উপভোগ করা। আমার সত্তার সবটুকু দিয়ে আমি তোমাদের অনুপ্রাণিত করতে চাই, বর্তমানকে দেখ, এই মুহূর্তে তোমার সামনে যে সময় বয়ে যাচ্ছে তাকে অনুভব করো। কারণ, শেষ পর্যন্ত তোমার জীবন বর্তমান কিছু মুহূর্তের সমষ্টি। অতীতের কোনো কথা ভেবে কষ্ট পেয়ে কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে একে তোমরা নষ্ট করো না। জীবন থেকে কখনো অনুপস্থিত থেকো না। তোমরা বুঝতে পারবে, জীবনটা আসলে আমাদের ইচ্ছা কিংবা চাহিদা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। জীবনে খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু জিনিসই আসলে আমাদের বড় কিছু করতে সাহস জোগায়। তোমাদের সন্তানের হাসি, মায়ের কণ্ঠস্বর, প্রিয় ফলের মিষ্টি ঘ্রাণ, শীতের বিকেলে জানালা দিয়ে গড়িয়ে পড়া বাঁকা রোদ—এ রকম সাধারণ জিনিসই আমাদের জীবনের বড় বড় অনুপ্রেরণা দেয়। এসব ছোট জিনিসকে এড়িয়ে যেও না। এগুলো অনুভব করতে তোমার জীবনের গতিকে মাঝেমধ্যে একটু ধীর করো। নিজেকে প্রশ্ন করো, জীবনে তুমি কি চাও, শান্তি না স্বাচ্ছন্দ্য? তিব্বতের বুদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘কোনটি আগে আসবে, আগামীকাল বা আগামী জীবন? আমরা কখনো সেটা বলতে পারি না’। তাই আমি তোমাদের বলব, কখনো এটা মনে করো না যে জীবন সামনে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। সব সময় পরের জিনিসটার জন্য বসে থেকো না। ভবিষ্যতের কোনো আইডিয়াতে নিজের সব সামর্থ্য ঢেলে দিয়ে নিঃস্ব হইও না। বর্তমান তোমার জন্য সম্ভাবনার অসংখ্য দ্বার খুলে অপেক্ষা করে আছে। জীবনকে একটা অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নাও, পরিবর্তনের পথিক হও। কখনো কখনো তোমাকে জীবনের মহৎ অ্যাডভেঞ্চারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। সেটা করার সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে আজ, এখন। কারণ, তোমাদের এখন আছে তারুণ্য এবং অদম্য কৌতূহল। তথাকথিত সাফল্যের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আটকে রেখ না। জীবন সঠিক পথে চললে সাফল্য তোমার হাতে অবশ্যই ধরা দেবে। মনে রেখো সাফল্য বেশির ভাগ সময়ই কেবল ব্যক্তিগত একটি ঘটনা, কখনো কখনো তা আকস্মিকও বটে। আজকে তোমরা তোমাদের পরবর্তী অ্যাডভেঞ্চারে নেমে পড়ছ। কোনো কিছু শুরু করার সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো এর অনিশ্চয়তা। যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো কীভাবে তুমি সেই অনিশ্চয়তাকে মেনে নাও এবং এর সম্মুখীন হও। পৃথিবী তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, একে ভ্রমণের মাধ্যমে তুমি নিজেকে আবিষ্কার করো। নিজেই নিজের পথপ্রদর্শক হও। কারও দ্বারা কোনো কাজে হতোদ্যম হইও না। যদি প্রয়োজন হয়, সোজা পথে না চলে পাশের সরু গলিপথ দিয়েও তুমি ভ্রমণ করতে পার। কিন্তু তোমার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পথচলার আনন্দটা খুঁজে পাওয়া। আমি প্রার্থনা করি, যাতে তোমরা শান্তির খোঁজ পাও। তোমরা মানবিক, সহানুভূতিশীল এবং এই পৃথিবীর যোগ্য মানুষ হও। তোমাদের হৃদয়ে যাতে একজন পরিব্রাজকের সাহস থাকে এবং তোমরা বর্তমানের প্রতিটি ক্ষণকে উপভোগ করো। তোমাদের জন্য রইল শুভকামনা। ধন্যবাদ। সূত্র: ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনীষ দাশ মানুষ চিনতে হবে ক্রিস গার্ডনার একজন আমেরিকান উদ্যোক্তা৷ গৃহহীন অবস্থা থেকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গার্ডনার রিচ অ্যান্ড কোম্পানি। তাঁর জীবনী অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’ বিশ্বব্যাপী তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’তে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ক্রিস গার্ডনার এই বক্তব্য দেন। প্রথমেই আমি তোমাদের সঙ্গে যে কথাটা ভাগাভাগি করে নিতে চাই, সেটা হলো জীবনে তোমাদের সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটার মোকাবিলা করতে হবে, সেটা হলো মানুষ। সেসব মানুষ, যাদের সঙ্গে বা যাদের জন্য তুমি কাজ করবে, তারা সব সময়ই চাইবে তোমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে। আজকের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তারা তোমাকে শিখিয়ে দেবে কী বলতে হবে, আর কীভাবেই বা তা বলতে হবে। সেদিন তোমাদের উচিত হবে, বিনয়ের সঙ্গে তাদের প্রত্যাখ্যান করা, এতে তোমাদের ভালো হবে। আমি আজকের বক্তৃতার জন্য প্রথম পছন্দ ছিলাম না, হয়তো দ্বিতীয় পছন্দও না। কিন্তু সম্ভবত আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছি। একই সঙ্গে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে তোমাদের কাছে আসতে পারতাম। তোমাদের আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্রই আমি তাতে সাড়া দিয়েছিলাম। তোমাদের অনেকে হয়তো জানো না, যখন ১৪ মাসের একটি শিশুকে ব্যাকপ্যাকে নিয়ে আমি কাজ করতাম৷ আমি ও আমার ছেলে তখন অনেক দিন এই ক্যাম্পাসে ঘুমিয়েছি। সে অবস্থান থেকে উঠে এসে আজকে যখন আমি এই মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছি৷ মনে হচ্ছে, আজকে যেন আমারও সমাবর্তন হচ্ছে। আরও অনেক কথা বলার আগে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সেসব মা-বাবা ও আত্মার আত্মীয়দের, যাঁদের জন্য আজকে তোমরা এখানে। জীবনের বড় সাফল্যগুলো কেউ একা অর্জন করতে পারে না। আজকে তোমাদের প্রত্যেকে এখানে পৌঁছাতে পেরেছ, কেননা চলার পথে তোমাকে কেউ না কেউ সাহায্য করেছিল। আমি বিশেষ করে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার মতো সিঙ্গেল মা-বাবাকে। সেসব বাবাকে যাঁরা সন্তানের জন্য মা হয়েছেন এবং সেসব মাকে যাঁরা পালন করেছেন বাবার দায়িত্ব। আমাদের জীবনে সবচেয়ে ভালো কিছু হলো, আমাদের মা-বাবা। কিন্তু তাঁরা ছাড়াও তোমার সাফল্যের পেছনে নিশ্চয় অন্য কোনো ব্যক্তির অনুপ্রেরণা আছে। কোনো একসময়ে কেউ হয়তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিল, তোমার মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা দেখেছিল, তোমাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছিল। সে ব্যক্তি তোমার ছোটবেলার শিক্ষক হতে পারেন, হাইস্কুলের কাউন্সিলর হতে পারেন অথবা হতে পারেন অতিসাধারণ একজন কর্মচারী। তুমি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করো। ই-মেইল কোরো না, মেসেজ পাঠিয়ো না, ফোন কোরো না—তাঁর সামনে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরো, তাঁর সঙ্গে হাসো, তাঁর হাত ধরে কাঁদো; তোমার ভালো লাগবে। আর যাঁরা বলেছিল তোমাকে দিয়ে হবে না, তুমি পারবে না; তাঁদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করো তোমার সম্পর্কে এখন তাঁদের কী অভিমত। আমি যখন নিজের ভাবনাগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিলাম তোমাদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য, আমি ভাবছিলাম তোমাদের জায়গায় আমি হলে কী শুনতে চাইতাম। দেশের অর্থনীতির অবস্থা, ওয়াল স্ট্রিটের হালচাল নাকি চাকরির বাজারের খবর? না, এর কোনোটিই আমি জানতে চাইতাম না। আমি জানতে চাইতাম একজন আমেরিকান হিসেবে আমাদের স্বপ্নের কথা, পূর্বপ্রজন্ম যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ দেশের জন্য কাজ করেছেন তার কথা। আমি জানতে চাইতাম যে আমাদের চেক ইন অ্যাকাউন্টের ব্যালান্সের চেয়ে আমাদের জীবনের ভারসাম্য অধিক জরুরি। জীবনে প্রার্থনার চেয়ে প্রশংসা অনেক বেশি দরকারি। আমি চাইতাম যাতে সমাবর্তন বক্তা আমাদের বলেন, বস্তুর আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখাটা বোকামি৷ কারণ, আমাদের একসময় ফিরে আসতে হবে পরিবার ও পরিজনদের কাছে। আমি তোমাদের জানাতে চাই যে তুমি কী করো, সেটা দিয়ে নিজেকে বিচার কোরো না । নিজের মোট আর্থিক সম্পদ দিয়ে মানবিক শক্তির তুলনা টেনো না। তোমার চারপাশে তুমি অনেক জিনিস দেখতে পাবে, কিন্তু জেনে রেখো সুখী হওয়ার জন্য তোমার এর কোনোটিরই প্রয়োজন নেই। তোমাদের জন্য এটাই আমার স্বপ্ন, যার ভিত্তি প্রোথিত আছে অতীতে, এটা বর্ণিত হচ্ছে বর্তমানে কিন্তু এর লক্ষ্য সুদূর অতীত ঘিরে। তোমরা আজকে বৃহৎ এক পৃথিবীতে পা রাখতে যাচ্ছো। তোমরা যা-ই করো না কেন, সব সময়ই সুখের সন্ধান করো। সুখী হও। সবাইকে ধন্যবাদ। সূত্র: ইউটিউব, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনীষ দাশ আমার মা: বারাক ওবামা পেছন ফিরে তাকালে খুবই খাপছাড়া লাগে মা-বাবার হঠাৎ করে বিয়ে করে ফেলাকে! বিয়ে তো হলোই, দেখতে দেখতে একটি শিশুও এল, সর্বসাকল্যে আট পাউন্ড দুই আউন্স! হাতে ও পায়ে ১০টি করে আঙুল, আর বিরামহীন কান্না! আমার জন্মের পরপরই মা-বাবা আলাদা থাকা শুরু করেন, আর আমার তিন বছর বয়সেই তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তাই বলা যায়, আমার জীবনের পুরোটাই মায়ের হাতে গড়া। একটা সময়, হাওয়াইতে আমি মা আর আমার বোন মায়ার সঙ্গে একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম, আমার স্কুল পুনাহো থেকে এক ব্লক দূরে। স্টুডেন্ট হিসেবে মা যে টাকা পেতেন, তা দিয়েই আমাদের তিনজনের কোনো রকমে চলতে হতো। যখন স্কুলের বন্ধুদের বাসায় নিয়ে আসতাম, ওরা মাঝে মাঝে মুখ ফসকে বলে ফেলত, ফ্রিজে এত কম খাবার কেন, ঘরদোরই বা সেভাবে গোছানো হয় না কেন। মা যখন এসব কথা শুনতেন, আমাকে এক পাশে টেনে এনে বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে বাবা ছাড়া দুটো সন্তানকে একা হাতে মানুষ করছেন তিনি, পড়াশোনা করছেন, কীভাবে সংসারটা চালাতে হচ্ছে তাঁকে। এত কিছু করার পর যে কুকি বানানোর সময় তাঁর থাকে না, সে যে কেউ বুঝতে পারে। আমি বুঝতাম সবই, মায়ের সঙ্গে অনেক গভীর একটা সম্পর্ক ছিল আমার। আমি মায়ের মুখে বাবাকে নিয়ে যা শুনেছিলাম, আমি নিশ্চিত, অন্তত কোনো সাদা মানুষের মুখে আর একজন কালো মানুষের জন্য এত গভীর ভালোবাসার কথা বেশির ভাগ আমেরিকানই কখনো শুনবে না। তাই তারা বিশ্বাসও করতে পারে না সাদা আর কালোর মধ্যে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, সে সম্পর্ক কতখানি নিবিড় হতে পারে। ভালোবাসার বন্ধন কতটা দৃঢ় হলে তা এত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে; না পাওয়ার কষ্ট, হতাশা, গ্লানি-সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে পারে। আমার মা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এই বই প্রকাশের কয়েক মাস পূর্বেই আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছেন। বেঁচে থাকতে তিনি সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আফ্রিকা, এশিয়ার গরিব নারীদের সেলাই মেশিন বা গরু কিনে দিয়ে সাহায্য করেছেন, শিক্ষার উপকরণ বিতরণ করেছেন। উঁচু ও নিচু সব শ্রেণীতেই তাঁর অনেক বন্ধু হয়েছিল, অনেক দূর পথে হেঁটেছেন, জ্যোৎস্না উপভোগ করেছেন, দিল্লি আর মারাকেশের বাজারে হইহল্লা করেছেন, রিপোর্ট লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, শিশুদের জন্য পোস্টারিং করেছেন এবং স্বপ্ন দেখেছেন। আমরা প্রতিনিয়ত একজন আরেকজনের সঙ্গে ছিলাম। বইটি লেখার সময় মা আমার ড্রাফটগুলো দেখতেন, ভুল ঠিক করে দিতেন। ক্যানসারকে তিনি হাসিমুখেই বরণ করে নিয়েছিলেন। আমাকে আর আমার বোনকে জীবনের হাল ধরার জন্য ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে যেতেন। আজ আমি আমার মেয়েদের মধ্যে আমার হারানো মাকে খুঁজে পাই। তাদের সারল্যে, উচ্ছ্বাসে, মায়ায়, হাসিতে আমি প্রতিদিনই আমার মাকে ফিরে পাই। আমি বোঝাতে পারব না মায়ের শূন্যতা আমাকে এখনো কতটা কাঁদায়। আমি শুধু বলব, মা আমার দেখা সবচেয়ে দয়ালুতার মুক্ত মনের মানুষ। আমার মধ্যে আজ যা কিছু ভালো, সবই তাঁকে দেখে শেখা, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া। আমার মধ্যে যা সবচেয়ে ভালো, সেটুকু মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। আমি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ, চিরঋণী। সূত্র: বারাক ওবামার শৈশবের স্মৃতিকথা, ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার বইয়ের নির্বাচিত অংশ। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার ৷ আলো আসবেই: অ্যাঞ্জেলিনা জোলি অস্কারজয়ী অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ১৯৭৫ সালের ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। জোলি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) বিশেষ প্রতিনিধি ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন। ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে ২০০৯, ২০১১ ও ২০১৩ সালের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেওয়া অভিনেত্রীর খেতাব দেয়। তিনি ২০১২ সালের মার্চ মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত উইমেন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড সামিটে এই বক্তব্য দেন। সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আপনাদের খুব সাধারণ একটি গল্প বলতে চাই। প্রায় এক কোটি মানুষের ছোট্ট একটা গল্প। তাঁরা অন্য দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তাদের বেঁচে থাকা মানে যেন শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া। এই মানুষগুলো যেন নিজভূমে পরবাসী। আমার এই গল্পের লাখো চরিত্রের বসবাস সোমালিয়ায়। আফ্রিকার যুদ্ধ আর জলদস্যুপীড়িত একটি ভূখণ্ডের নাম সোমালিয়া। আর এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে যিনি নায়ক, তিনি একজন নারী। সোমালিয়ার সেই বিশালসংখ্যক সাধারণ মানুষের জীবন পরিবর্তিত হয় এই একজন নারীর কারণে। সেই নারী অন্য গল্পের নায়কদের মতন নন। আমাদের জীবনের গল্পের লাখো সাধারণ মানুষের নায়ক সেই নারী। এ যেন রুপালি পর্দার বিভিন্ন সিনেমায় দেখা, বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতে ছুটে আসা নায়কের ঘটনা। সেই নারী এগিয়ে আসেন সোমালিয়ার উদ্বাস্তু মানুষের জীবন বাঁচাতে। হয়তো সিনেমার পর্দার নায়কের মতো তাঁর নেই তেমন শক্তি, তেমন গ্যাজেটস আর অ্যানিমেশনের কারিগরি প্রযুক্তি। কিন্তু তিনি আফ্রিকার অতিপরিচিত এক নাম, সবাই তাঁকে চেনে চিকিৎসক হাওয়া আবেদি নামেই। সোমালিয়ার মানুষের কাছে তিনি আশার আলো, মোমবাতির সঙ্গে তাঁকে তুলনা করা যেতে পারে। তরুণ বয়সে বিদেশে পড়াশোনা শেষে তিনি ইচ্ছা করলে গ্রহণ করতে পারতেন স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন। কিন্তু নিজের দেশের মানুষের অসহায় আর মানবেতর দৈন্য অবস্থা তিনি সহ্য করতে পারেননি। পাশ্চাত্যের রঙিন জীবন ছেড়ে ফিরে আসেন দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার মাটিতে। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সেই সময়ের এই ভূখণ্ডের অন্যতম বড় এক হাসপাতাল। আশ্চর্যজনকভাবে সত্য সেই ব্যক্তিগত হাসপাতালে ছিল একটিমাত্র কক্ষ। সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর খুব কাছের সেই এক রুমের হাসপাতাল ছিল এই জনপদের জন্য আশীর্বাদ। সোমালিয়া অনেক দিন ধরেই অশান্ত এক জনপদ। সেই জনপদে জীবনধারণ যেন কঠিন, দুঃস্বপ্ন। মাদক আর যুদ্ধই যেন সোমালিয়ার সত্যিকারের বাস্তবতা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা ধর্ষণ, গুম, হত্যা, অপহরণসহ নানা ধরনের জরায় বিপর্যস্ত গোটা সোমালিয়া। এ যেন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সমাজজীবনের খণ্ডচিত্র মাত্র। এখন দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত এই জনপদ। মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে ১০ লাখ সোমালীয় মারা যায়। এর অর্ধেক হারায় তাদের বসবাসের ঠিকানা। ন্যায় আর মানবতা যখন এই জনপদে উপকথা, তখন আবেদি এগিয়ে আসেন মানবতার সেবায়। যুদ্ধ শুরু হলে সেই এক রুমের হাসপাতালে ঢল নামে মানুষের। অসুস্থ আর আহত মানুষের সারি বিল্ডিং ছাড়িয়ে সামনের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়ে সেই যুদ্ধ সমাপ্ত হলেও সেই ভঙ্গুর মানবতা এখনো মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। তাই আমার গল্পের নায়ক সেই আবেদির কাজ এখনো শেষ হয়নি। দিনে দিনে তাঁর কাছে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক এক করে পাঁচ হাজার, ১০ হাজার, ৩০ হাজার করে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৯০ হাজারে। শুধুই কি আহত নিরীহ মানুষ তাঁর হাতে চিকিৎসা নিয়েছে? জলদস্যু, ডাকাত থেকে শুরু করে ভাড়াটে যোদ্ধার দল আহত হলে ছুটে আসে তাঁর কাছে। সেসব আহত আর নিপীড়ত মানুষের কাছে আবেদির হাসপাতাল হয়ে ওঠে স্বর্গোদ্যান। আবেদি আর দুই চিকিৎসক-কন্যাই সেই স্বর্গোদ্যানের স্রষ্টা। যাঁর হাতে সৃষ্টি হয় এই স্বর্গোদ্যান, সেই আবেদিকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। আক্রমণ করে তাঁর মেডিকেল ক্যাম্প। কিন্তু যেই আবেদির হাতের ছোঁয়া পেয়ে যারা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে, সেই সাধারণ মানুষও তখন চুপ করে থাকেনি। এগিয়ে আসে তাঁর ক্যাম্প রক্ষায়। সাধারণ মানুষের গণপ্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপের মুখে মুক্ত হন আবেদি। মুক্তি পেয়ে তিনি এগিয়ে আসেন সাধারণ মানুষের কাতারে। কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন, সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বলেন। তাঁর কথা কেউ না শুনলেও তিনি হতাশ নন। আলো আসবেই বলে তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন। জাতিসংঘ হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে। সেই দুর্ভিক্ষে মারা গেছে অনেক মানুষ। পুরো পৃথিবী সেই দুর্ভিক্ষে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগেই এগিয়ে আসে এই মহৎ প্রাণ। দুর্ভিক্ষের সেই সময় ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দেয় নিউমোনিয়ার প্রকোপ। সেই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সহায় ছিলেন তিনি। আল-কায়েদাসহ আরও সন্ত্রাসী দলের হুমকির তির ছুটে আসে তাঁর দিকে। ক্যাম্প বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর আসে শ্বাস বন্ধের হুমকি। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। ‘আমার সন্তান, তার সন্তানের সন্তান, তাদের সন্তানেরা বদলে দেবে আগামীর সময়। তাদের সততা আর মানবতা বদলে দেবে আগামীর পৃথিবী।’ এটা আমার কথা নয়, গল্পের নায়ক আবেদির কথা। অস্থির সামাজিক অবস্থা, দারিদ্র্য আমাদের মানবতার হুমকি। সহস্র বছর আগে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয় উল্কাপিণ্ডের আঘাতে। আমরা মানুষেরা বোধ হয় নিজেদের ভুলের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাব। এক পৃথিবীর মানুষ আমরা। আমার মতোই রক্ত-মাংসে গড়া আরেকজন মানুষ কেন আমার ভুলে, আমাদের কারণে হারিয়ে যাবে। আমরা কি বসে বসে টিভিতে এসব খবর দেখব আর আফসোস করব। আগামীর শিশুদের জন্য, আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আবেদিসহ যাঁরা এখন আগামীর জন্য পৃথিবী বিনির্মাণ করছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। আমরাও এগিয়ে যাব সামনের দিকে। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ। ইংরেজি থেকে অনূদিত নতুন করে সামনে চলো: জেমস ক্যামেরন জেমস ক্যামেরন। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা। তাঁর প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই নির্মাণশৈলী ও ব্যবসা-সফলতার ক্ষেত্রে ইতিহাস গড়েছে। টারমিন্যাটর-২ (১৯৯১), টাইটানিক (১৯৯৭) কিংবা অ্যাভাটার (২০০৯)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। ক্যামেরন ১৯৫৪ সালের ১৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নাসার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি ২০০৫ সালে অ্যামেরিকান ইনস্টিটিউট অব অ্যারোনাটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনাটিকসের প্রথম মহাকাশ অভিযান সম্মেলনের সমাপনীতে এই বক্তব্য দেন। সবাইকে স্বাগত। আমাকে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি নভোচারীদের মতো মহাকাশে বসবাস নিয়ে কাজ করি না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমি মহাকাশ গবেষণা নিয়ে অনেক আগ্রহী। আমার মস্তিষ্ক ও হূদয়ের পুরোটা জুড়ে ছিল তখন মহাকাশ। ছোটবেলায় আমি মহাকাশ নিয়ে যতটা উত্তেজিত থাকতাম, ঠিক এই মুহূর্তে সেই উত্তেজনা এখনো আমার মধ্যে ভর করে আছে। আমি মহাকাশবিশারদ নই, কিন্তু মহাকাশে মানুষের অভিযান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। আমি সেই স্বপ্নের কথাই জানাতে চাই আপনাদের। বছর কয়েক আগে খেয়াযান কলম্বিয়ার দুর্ঘটনা ঘটে, যা আমাদের মহাকাশে বসবাসের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, সেই দুর্ঘটনা আমাদের জন্য একধরনের স্বপ্ন দেখার প্রেরণাও বটে। এর আগেও অনেকগুলো মহাকাশযান দুর্ঘটনা আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু প্রতিবারই আমরা মানুষ নতুন করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিই। আমরা আবারও নতুন খেয়াযান তৈরি করে মহাকাশে যাই। অতীতের দুর্বলতাকে কাটিয়ে এগিয়ে যাই সামনের দিকে। এটাই তো মানবধর্ম। আমরা শত ঝুঁকি নিয়ে মহাকাশে নভোচারীদের আমাদের মানবসভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাই। আমাদের মাথায় অনেক হিসাব থাকে। সেই নভোচারীদের জীবন, খেয়াযান আর প্রতিটি মুহূর্তের দাম তখন কোটি কোটি ডলার। ছোট একটা ভুলেই সব ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা সেই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই মহাকাশ অভিযানের স্বপ্ন দেখি। আমাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অদূর ভবিষ্যতে কি আমরা রোবটদের মহাকাশে পাঠাব? আমি নাসার উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য। তাই খেয়াগবেষণা নিয়ে কী রকম চিন্তা-বিচিন্তা করতে হয়, সেটা বেশ ভালোভাবেই জানি। এটাকে চিন্তা না বলে, দুশ্চিন্তার বড় কিছু থাকলে সেটাই বলা উচিত। একেকটা দুর্ঘটনা আমাদের নিজেদের ওপরেই বিশ্বাসের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়। কলম্বিয়া খেয়া দুর্ঘটনা ছিল তেমনই। কিন্তু আমরা হতাশ হইনি। আজ সূর্য ডুবলে তো কাল উঠবেই। আমরা মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা নিই। পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। সামনে চলো। লাল গ্রহ মঙ্গলের বুকে ছুটে চলা একেকটি রোভার যেন আমাদের মানবজাতির স্বপ্ন। এই রোভারগুলো শুধু আমাদের স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখে না। আমাদের মানুষের জ্ঞান আর জানাশোনা জীবকুলের মধ্যে কতটা উত্তম, সেটাই প্রকাশ করে। আমাদের রোবটিক প্রতিনিধি রোভারগুলো অন্য গ্রহের রহস্য উন্মোচন করে চলেছে। রোভারগুলো ভবিষ্যতে মানুষের পায়ের ছাপ কোথায় রাখবে, সেটাই নির্দেশ করার কাজ করে চলেছে। ধূলিমাখা সেই গ্রহের যান্ত্রিক চাকার ছাপ পড়া পথেই তো একদিন মানবজাতি হেঁটে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখে। লাল গ্রহ মঙ্গলের গায়ে এখন এলিয়েন গ্রহের তকমা নেই। মঙ্গলই হবে আমাদের আগামীর গ্রহ। সাধারণ মানুষ যারা মহাকাশের গোপন রহস্য বোঝে না, তারাও আজ মঙ্গলে মানুষের প্রতিনিধি দেখে খুশি হয়। কল্পনা যে তাদের চোখের সামনে এখন বাস্তবতা। চন্দ্রজয় আমাদের মানবসভ্যতার অনন্য একটি ঘটনা। অ্যাপোলো ১১ খেয়াযানের সেই মিশন ছিল আমাদের স্বপ্ন ছোঁয়ার সংগ্রাম। পরিত্যক্ত এক উপগ্রহে ছিল প্রাণসঞ্চারণের এক ভয়াবহ ও দুঃসাহসী সেই মিশন। সবকিছুর একটা ভালো শুরু লাগে। গত শতকের পঞ্চাশ দশকে রাশিয়ানরা মহাকাশে স্ফুতনিক পাঠাল। ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশ অভিযানের সূচনা করলেন। সেই যে শুরু হলো। এখন আমরা স্বপ্ন দেখি মঙ্গলে মানুষ যাবে। আমাদের এই লক্ষ্য পূরণ করতেই হবে। মানুষ স্বপ্ন দেখত আকাশ ছোঁয়ার। সেই ক্ষুদ্র মানুষগুলোর এখন স্বপ্ন-মহাকাশে বসবাস। ব্রুকলিন ব্রিজের নকশাকার জোহান রোয়েবলিং তাঁর সৃষ্টিকর্ম সেই ব্রিজ সম্পর্কে একবার বলেছিলেন, কোনো মানুষই এই ব্রিজকে স্বপ্নে দেখেনি। আর যখন স্বপ্ন পূরণ হলো, তখন তারা এই ব্রিজকে দেখে বুক ফুলিয়ে মানবসভ্যতার জয়গান গেয়েছে। আমাদের মহাকাশ গবেষণায়ও এমনটি হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সে আমি নীল আর্মস্ট্রংকে টিভির পর্দায় চন্দ্রে পা রাখতে দেখি। নীল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিনকে দেখে আমার কান্না চেপে রাখতে পারিনি। চন্দ্রবুকে তাঁদের পদচিহ্ন তো আমারই পায়ের ছাপ। আমার মতো শতকোটি মানুষের আবেগ ছিল এমনই। আমার নিজেকে মানুষ হিসেবে তখন অনন্য মনে হয়েছিল। খেয়াযান যখন অগ্নস্ফুিলিঙ্গ ছুটিয়ে ধেয়ে যায় মহাকাশপানে, তখনকার অনুভূতি কী অসাধারণ নয়? যাঁরা সামনাসামনি খেয়াযানের উড্ডয়ন দেখেছেন, তাঁরা জানেন, ৯, ৮, ৭, ৬ করে যখন ০ বলে ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে খেয়াযান ছুটে যায়, তখন বুকের মধ্যে কেমন অনুভূতি হয়। সারা শরীরে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে যায়। আমরা মানুষ কত কিছুই না পারি! স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন কি একজনে দেখে? কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন এটি। মহাকাশ অভিযান কোনো একক স্বপ্ন নয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বর্ণনা এক মুহূর্তে কি দেওয়া সম্ভব। মানুষের উদ্ভাবনী দক্ষতা প্রকাশের এক অনন্য ক্ষেত্র হলো মহাকাশ গবেষণা। অজানা কোনো গ্রহে দাঁড়িয়ে একজন নভোচারীর কৌতূহলী দৃষ্টিই তো আমার দৃষ্টি, আমাদের চোখই তো সেই চোখ। সেই নভোচারীর কণ্ঠ তো আমারই কণ্ঠ। আমি সেই নিঃসঙ্গ গ্রহে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকব, আমি অন্ধকারকে ভয় পাই না। আমি সামনে অজানা যা দেখছি, তা বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমি ভীত নই। এই রহস্য আমি উন্মোচন করবই। অজানাকে জানার এই মনোমুগ্ধ রহস্য আর সৌন্দর্যকে দেখার জন্যই তো জন্ম আমার, আমাদের। ভাস্কো দা গামা, ম্যাজেলান, কুকদের মতো অভিযাত্রীদের কল্যাণে সে সময়কার মানুষ অনেক নতুন কিছু জানতে পারত। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে ছিলেন বলেই পৃথিবীবাসী উপকৃত হয়েছে। তাঁদের অভিযানগুলোর সাফল্য আর ব্যর্থতা নিয়েই তো আমাদের ইতিহাস। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের অনন্য এক উৎকর্ষ সময়ে বসবাস করছি। মহাকাশ অভিযান এখন বিলাসিতা নয়। আমাদের এখনকার সভ্যতার আদর্শ এটি। আগে মানুষ সমুদ্রে যেত অভিযানে, এখন মহাকাশে। সময় এগিয়ে যায়, মানুষের জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষুধাও বেড়ে যায়। তাই তো বসে থাকলে চলবে না। আগে বাড়ুন! শত বাধাকে পাশ কাটিয়ে আগে যেতে হবেই। তো আমরা বসে আছি কেন? মানবসভ্যতার মঙ্গল অভিযান মঙ্গল হোক। চলুন সবাই সেই অভিযানে। ধন্যবাদ সবাইকে। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: জাহিদ হোসাইন খান ভয়কে করো জয় এমি অ্যাওয়ার্ড ও গোল্ডেন গ্লোব বিজয়ী অভিনেত্রী কেরি ওয়াশিংটনের জন্ম ১৯৭৭ সালের ৩১ জানুয়ারি। টাইম ম্যাগাজিন-এর এপ্রিল ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির’ মধ্যে কেরি অন্যতম। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনির্ভারসিটির সমাবর্তনে ২০১৩ সালের ১৯ মে তিনি এই বক্তৃতা করেন। অভিনন্দন, ২০১৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা! মনে হচ্ছে এই তো সেদিন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আজও এখানে আমার বাবা-মা উপস্থিত আছেন। আমি যে গাউনটা পরে আছি, সেটা আমার মা ড. ভ্যালেরি ওয়াশিংটনের। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ আমাকে যে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে, তার জন্য আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। কিন্তু চার বছর পরিশ্রম করে যে ডিগ্রি আমি অর্জন করেছিলাম, তা নিয়ে আরও বেশি গর্ববোধ করি। স্বাগত তোমাদের সবাইকে, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তোমাদের আবারও অভিনন্দন। পেশাগত জীবনে আমি একজন অভিনেত্রী। অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের গল্প বলি। আজও তার ব্যতিক্রম হবে না। আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছিলাম, তখন অভিনেত্রী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না। আমি ভাবতাম, মনোবিজ্ঞানী অথবা মায়ের মতো শিক্ষাবিদ হব। অভিনয় ছিল বড়জোর শখ, যা আমাকে এখানে পড়ার খরচ চালাতে সাহায্য করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি যে বৃত্তি পেতাম, তার অনেকগুলো শর্তের মধ্যে একটি ছিল নাট্যকলা ও নৃত্য বিভাগ থেকে যতগুলো অনুষ্ঠান করা হবে, তার সব কটির জন্য আমাকে অডিশনে অংশ নিতে হবে। অভিনয় নিয়ে আমাকে পড়তে হয়নি, তার বদলে আমি মানুষের নানা দিক নিয়ে পড়েছি, যেমন মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও নৃতত্ত¡। মানবসমাজ নিয়ে পড়তে গিয়ে আমাকে একটা বিষয় মুগ্ধ করেছিল, তা হলো, মানুষের গল্প বলার সংস্কৃতি ও সমাজে এর প্রভাব। সভ্যতার শুরু থেকেই সব সমাজের অধিবাসীরা তাদের জীবনের গল্প নানাভাবে বলে গেছে, গল্প দিয়েই আমরা একে অন্যকে বুঝতে পারি, নিজেদের বুঝতে পারি। যখন আমরা কোনো একটা গল্পে গভীরভাবে ডুবে যাই, সে কোনো উপন্যাস, চলচ্চিত্র বা প্রামাণ্যচিত্র Ñযা-ই হোক না কেন, তখন আমরা নিজেদের আরও বেশি করে বুঝতে পারি। বুঝতে পারি বর্তমানে আমরা কে, আর ভবিষ্যতেই বা কেমন হতে চাই। অথবা কেমন অবস্থায় আমরা কখনো পড়তে চাই না। গল্প আমাদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে, আমাদের বদলে দেয়। কোনো গল্পের নায়কের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তখন উপলব্ধি করি, আমরা প্রত্যেকেই আমাদের নিজেদের জীবনের নায়ক। আমি আজ এই সত্যটা তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের জীবনের গল্পের মূল চরিত্র। তোমার জীবনকে ঘিরেই গল্প, তোমার গল্প নিয়েই পৃথিবী। জীবনের রোমাঞ্চকর যাত্রায় নিজের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোই হলো তোমার উদ্দেশ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি জোসেফ ক্যাম্পবেলের লেখার সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি লিখেছিলেন: সব পথিকের যাত্রা শুরু হয় কোনো না কোনো আহ্বান থেকে, কেউ একজন এসে তাকে বলে, ‘জেগে ওঠো, আর ঘুমিও না, বেরিয়ে পড়ার সময় এসেছে।’ আমাদের সবার মধ্যে একটা সুপ্ত চেতনা থাকে, সঠিক সময়ে যার ঘুম ভাঙাতে হয়। একেই বলে স্বাচ্ছন্দ্যকে দূরে সরিয়ে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে পা রাখা। সহজ কাজ নিয়ে পড়ে থাকার লোভ সংবরণ করে সঠিক কাজটি করা। ১৯৯৬ সালে আমি যখন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন আমার সামনে এমন একটা আহ্বান এসেছিল। বৃত্তি পাওয়ার শর্তের অংশ হিসেবে আমাকে একটি নতুন নাটকের জন্য অডিশন দিতে বলা হয়, যা ছিল ব্যাঙ নিয়ে লেখা একটি গীতিনাট্য! গল্পটা ভারি সুন্দর ছিল, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন ও পরিবেশ সংরণকে উপজীব্য করে লেখা। কিন্তু ব্যাপার হলো, আমি ভাবিনি আমাকে কখনো ব্যাঙের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। সবাই এমনিতেই কেমন হাসাহাসি করবে, আর খারাপ করলে কীভাবে মুখ দেখাবÑ এই চিন্তায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ভাবলাম, যদি কোনোভাবে অডিশন থেকে বাদ পড়া যায়, তাহলেই ঝামেলা চুকে যাবে। ক্যাম্পবেল তাঁর লেখায় এই ব্যাপারটির কথাও বলেছেন, যখন আমাদের সামনে কোনো সুযোগ আসে, কিন্তু আমাদের তা নেওয়ার সাহস হয়ে ওঠে না। আমাদের ভয়, নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর অনাস্থাÑ সবকিছু আমাদের প্রভাবিত করে সুযোগটিকে দূরে সরিয়ে দিতে। যা-ই হোক, আমি সাহস করে অডিশনে হাজির হলাম, নিজের দ্বিধা কাটিয়ে পরিচিত গণ্ডির বাইরে পা রাখলাম। অবাক হলেও সত্যি, অডিশনে আমাকেই বেছে নেওয়া হলো। এবার আরেক নতুন ভয় এসে ঢুকল মাথায়৷ আমি কীভাবে এমন চ্যালেঞ্জিং একটা চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতে পারি? আমি ঠিক করলাম, ব্যাঙ নিয়ে পড়াশোনা করব! আমি চিড়িয়াখানায় গিয়ে সেখানকার ব্যাঙগুলোর দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতাম। ব্যাঙ নিয়ে যা কিছু পাই, সব পড়তে শুরু করলাম, প্রামাণ্যচিত্র দেখলাম। এমনকি ব্যাঙ হাতের তালুতে নিয়ে বসেও থাকতাম! আমার পুরো শরীর দিয়ে কীভাবে ব্যাঙের চরিত্রটিকে রূপ দেওয়া যায়, তার উপায় বের করলাম। হ্যাঁ, আমি আমার ভয়কে জয় করে মঞ্চে পা রেখেছিলাম। সেদিনের সেই অভিনয় আমার নিজের সম্পর্কে ধারণা আমূল বদলে দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, আজ পর্যন্ত আমি যত চরিত্রে অভিনয় করেছি, তার মধ্যে সেই ব্যাঙটিই আমার বাবার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র! তোমাদের প্রত্যেকের ভেতরে দারুণ সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। প্রত্যেকের জীবনের গল্পই অন্য সবার চেয়ে আলাদা, অদ্বিতীয়। পরিচিত পরিবেশের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখে তোমরা এই ডিগ্রি লাভ করোনি। আজ তোমাদের আহ্বান জানাব গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে, একটু পেছনে ফিরে তাকাতে। কোন মুহূর্তগুলো সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল? কখন সুযোগ এসেছিল নতুন কিছু করার, গণ্ডির বাইরে পা রাখার? মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়কে কীভাবে জয় করেছ? এই স্মৃতিগুলো মনে রেখো, এগুলো তোমাকে সাহস জোগাবে। তোমরা সবাই ভয়কে জয় করতে পারবে, কিন্তু করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত কিন্তু যার যার নিজের। আজ এখান থেকে বের হয়ে তোমরা যে নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ, সেখানে তোমাদের সামনে অনেক পথ খোলা থাকবে। তোমরা অন্যকে খুশি করার পথ বেছে নিতে পারো, লোকে তোমার কাছ থেকে যা আশা করে, ঠিক তা-ই করতে পারো। কখনো ভয় পেলে চুপটি করে নিজের ভেতরে গুটিয়ে যেতে পারো, চ্যালেঞ্জকে দূরে ঠেলে নিরাপদ থাকতে পারো। অথবা, জীবন থেকে অনুপ্রেরণার মুহূর্তগুলো খুঁজে বের করতে পারো, নিজেকে নিজেই সাহস জোগাতে পারো। অন্তরের শক্তিতে জাগ্রত হয়ে নিজের জীবনের গল্প নিজেই লিখতে পারো। যদি এসব করো, তাহলে তোমাদের জন্য অসম্ভব বলে কিছু থাকবে না। আমি জানি, তোমরা অনেকেই এই পথ বেছে নেবে, অনেকে ইতিমধ্যে নিয়েও ফেলেছ। আমার চোখে তাই তোমরা কেবল গ্র্যাজুয়েট নও, তোমরা জীবনের পথে একেকজন অভিযাত্রী। তাই যখন নতুন কিছু করার সুযোগ আসবে, ভয় না পেয়ে সে আহŸানে সাড়া দিয়ো। অন্যরা কী করেছে, এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নাও। তুমি, হ্যাঁ, কেবল তুমিই পারো তোমার জীবনকে ইচ্ছামতো সাজিয়ে তুলতে। তোমার গল্প তো পৃথিবীকে তুমি শোনাবে, নাকি? পৃথিবী তোমার কণ্ঠ শুনতে চায়। আর যত সামনে এগিয়ে যাবে, তোমার গল্প শুনিয়ে তুমি আরও অসংখ্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে তাদের জীবনের গল্পটি খুঁজে নিতে। আমি সেই গল্পগুলো শোনার অপোয় রইলাম। সূত্র: ইন্টারনেট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার যেভাবে বেড়ে উঠি - নেইমার৷ শৈশব থেকেই আমি সবার সঙ্গে মজা করতে, খেলতে আর নিজেকে নিয়ে থাকতে পছন্দ করি। ওই সময়টায় সমবয়সীদের সঙ্গে অনেক দুষ্টুমি করেছি, সেসবের মধুর স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমার শৈশব সাধারণ ছিল, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে করা সব দুষ্টুমি সেটাকে রঙিন করে তুলেছে। রাস্তায়-সাগরতীরে বল নিয়ে খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, বাইকে চড়া, লুকোচুরি খেলা—কী অসাধারণ একটা সময় কাটিয়েছি! আমার এক আঙ্কেল ও আন্টি আছেন, যাঁরা ভালো গিটার বাজাতে পারেন। তাই আমাদের বাসায় সব সময় গান চলতে থাকত। সাম্বা, প্যাগোডা, গস্পেল—যেকোনো ধরনের সুরই আমাদের বাসায় শোনা যেত, সে সঙ্গে নাচ তো আছেই। আমার খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার বাবার। আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশটাই ছিল ফুটবলকে ঘিরে। যখনই সুযোগ পেতাম, বাবার সঙ্গে ট্রেনিংয়ে যেতাম, তাঁর ম্যাচ দেখতাম। তাঁর হাত ধরেই আমার খেলতে শেখা এবং এখনো তিনি আমাকে খেলা নিয়ে উপদেশ দেন। তিনি সব সময় বলেন, তিনি এমন খেলোয়াড় ছিলেন যে সামর্থ্যের পুরোটুকু দিয়ে খেলতেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শেষদিকটা আমার মনে আছে, কারণ তিনি যখন খেলা শুরু করেছিলেন, তখন আমি খুবই ছোট ছিলাম। মাঝেমধ্যে তাঁর খেলার ভিডিওগুলো দেখি। একটি ভিডিওতে তিনি হেড দিয়ে গোল করার পর পাগলের মতো নাচতে আরম্ভ করলেন। এখন আমি গোলের পর সেলিব্রেশনের অনুপ্রেরণা তাঁর কাছ থেকেই পাই। রাস্তায় আমি প্রচুর খেলেছি, সাগরতীরেও। ছোটবেলা থেকেই ফুটসাল আমার কাছে একটা নেশার মতো। (ফুটসাল ৫/৬ জন মিলে ছোট পরিসরে খেলা ফুটবল খেলা বিশেষ) ফুটসাল পিচেই আমার ফুটবল খেলা শেখার শুরু। আমি মনে করি, একজন খেলোয়াড়ের ট্রেনিংয়ে ফুটসাল অনেক দরকারি, এটা দ্রুত চিন্তা করতে শেখায়। শর্ট সার্ভ করতে, জলদি পাস দিতে আর জোরে শুট করতে ফুটসাল সাহায্য করে। ফুটবল একটা দলীয় খেলা এবং আমি মাঠে নামি দলকে সাহায্য করতে। একটা দলে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অবশ্যই ভূমিকা রাখে, কিন্তু খেলায় শেষ পর্যন্ত দলই জয়ী হয়। খেলায় উন্নতির কোনো সীমা নেই। আমার বাবা ছোটবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন ট্রেনিংয়ে নিজের শক্তির শেষটুকু ঢেলে দিয়ে আসতে এবং আমি এখনো সেটা মেনে চলি। বাঁ পায়ে শট নেওয়া, মার্কিং, ফিনিশিং, হেডিং—উন্নতির হাজারো জায়গা আছে এবং তাতে থেমে গেলে চলবে না। আমি জানি, আমি অতটা লম্বা নই, তাই হেডিংয়ে প্রচুর সময় দিয়েছি। সঠিক মুহূর্তে লাফিয়ে উঠে বলে মাথা ছোঁয়ানো—এই কাজটি করতে অনেক ট্রেনিং ও মনোযোগের প্রয়োজন। আমার কাছে আনন্দে থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের ভেতরে-বাইরে আমি একই ব্যক্তি। বাসায় আমি কার্ড খেলি, ভিডিও গেম নিয়ে মেতে থাকি, গান শুনি, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, বারবিকিউ বানাই। তখন মজা করাটাই আমার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়। গোল করার অনুভূতিটা স্বর্গীয়, কিন্তু এর চেয়েও দামি অনুভূতি হলো দলকে জেতাতে ভূমিকা রাখা। যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনে স্বপ্ন থাকে নিজের দেশের হয়ে খেলার। যে জার্সি পরে আমার ছোটবেলার মহানায়কেরা খেলেছেন, ব্রাজিলের সেই জার্সি পরার অনুভূতিটা আমি কখনো ভুলতে পারব না। প্রথম যেদিন আমি জাতীয় দলে ডাক পেলাম, আমার আশৈশবলালিত স্বপ্ন পূরণ হলো। মাঠে আমার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে খেলি দেশের জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য, যাঁরা জীবনে এতকিছু পেতে আমাকে সাহায্য করেছেন। ব্রাজিল দলের অন্যতম স্ট্রাইকার নেইমার৷ তাঁর জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। নেইমার ১২৯ ক্লাব ম্যাচে ৬৩ গোল ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০ ম্যাচে ৩৩ গোল করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘সাউথ আমেরিকান ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ সম্মান লাভ করেন তিনি। ২০১১ সালে ফিফা পুসকাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৩ সালে দ্য গার্ডিয়ান নেইমারকে পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় ৬ষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দেয়। সূত্র: হাইসনোবিটি ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন মনীষ দাশ ক্যারিয়ারে ১৪টি লাল কার্ড পেয়েছি!- জিনেদিন জিদান ৯৯৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের মার্সেইতে ১৯৭২ সালের ২৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন৷ জিদান ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার সম্মাননা লাভ করেছেন তিনবার, একবার ব্যালন ডি’অর৷ ২০০৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপে তাঁর অনবদ্য নৈপুণ্যে ফ্রান্স ফাইনালে ওঠে, জিদান লাভ করেন গোল্ডেন বল। আমার বাবার কাছ থেকেই আমি সবকিছু শিখেছি। তাঁর কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, অন্যকে সম্মান দেওয়া। আমার বাবা আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সে আসেন, যা ছিল তাঁর জন্য দুঃস্বপ্ন। নতুন জায়গায় কাজের সন্ধান ও ফ্রান্সের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর জন্য বেশ কঠিন৷ নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বাবাকে সব সময় সংগ্রামের মধ্যে থাকতে হতো। বাবা সেই কষ্টের গল্প থেকে আমাকে অনন্য একটা কথা শিখিয়েছিলেন। অন্যদের সম্মান অর্জনের জন্য আপনাকে সব সময় দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে। সম্মান আদায় করতে চাইলে অন্যদের সম্মান দিতে হবে। আমার বাবার এই শিক্ষা আমি আমার সন্তানদের দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলায় আমার মনে হতো, আমি নিয়ম-শৃঙ্খলার জালে বন্দী। আমার শৈশব ছিল বেশ কঠিন, সবকিছু নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। কিন্তু এখন টের পাই, সেই কঠিন শৈশবের কারণেই আমি এখন জীবনের বড় বড় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারি খুব সহজে। বাবা আমার জন্য ছিলেন বাতিঘর। সেই বাতির আলো থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার পুরো ক্যারিয়ারে প্রয়োগের আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। যেকোনো পরিবারের জন্য বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি বড় ধরনের একটা সুবিধাও বটে। যেসব শিশুর বাবা-মা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, সে শিশুরা ব্যতিক্রম হয়। তারা অন্যদের চেয়ে বেশি উদার হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ছোঁয়ায় তারা অনন্য হয়। আমার সন্তানদের দিকে তাকালে এটা সবাই বুঝতে পারবে। আমি ছোটবেলায় রাস্তায় ফুটবল খেলতাম; যেখানে আমি খেলতাম সেরাদের সেরার মতো, আমার নিজের মতো। বল নিয়ে সেই দুরন্ত কৈশোর ছিল আমার জন্য স্মরণীয় এক সময়। তখনো আমি জানতাম না, ফুটবল খেলা খুবই মজার একটি কাজ। জীবনে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র চাবি হলো সাহস। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহসী হওয়ার বিকল্প নেই৷ সাহসীরা ব্যর্থ হয় না। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নতুন করে পথ খুঁজে নেয়। মানুষের জীবন অনেকটা বরফে চলা স্লেজ গাড়ির মতো—সব সময় দৌড়ের ওপর থাকে। কখনো কখনো পথ চলতে মনে হবে, আরে, কষ্ট ছাড়াই তো পর্বতের ঢাল বেয়ে নেমে সামনে যাওয়া যায়! কিন্তু সামনে যখন পর্বতের খাড়া অংশ হাজির হবে, তখন সেটা পার হতে আপনার সাহসই হবে আপনার একমাত্র সহায়, একমাত্র উপায়। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তার সাহস। আমার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ১৪টি লাল কার্ডের দেখা পাই, যার মধ্যে ১২টির একমাত্র কারণ ছিল রাগ। আমাকে যখন অন্যরা কথার মাধ্যমে রাগিয়ে তুলতে পেরেছে, তখনই আমি লাল কার্ডের দেখা পাই। এটা নিঃসন্দেহে গর্বের কোনো কারণ নয়। আমি আমার পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না। আমার অন্যায় সহ্য করার ক্ষমতা কম, তাই আমি রেগে গিয়ে লাল কার্ড দেখার কাজ করতাম। যদিও আমি মাঠের বাইরের উল্টো। সাধারণ জীবনে আমি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করি। আমি কাউকে কখনোই রাগানোর চেষ্টা করি না। কখনোই কারও সঙ্গে প্রতারণা করি না। সারা জীবন এই সাধনা করে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমি যখন নিজে বাবা হই, সেটা ছিল অন্য রকম অভিজ্ঞতা। আমি বড় আঙ্গিকে জীবনকে দেখার সুযোগ পাই। বাবা হওয়া মানেই সন্তানকে পড়াশোনা করার দায়িত্ব নয়। আপনি যা জানেন, জীবন সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছেন, তা আপনার সন্তানকে জানানো আপনার কর্তব্য। আমার জন্য ফুটবল খেলার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের সময় দেওয়া ছিল বেশ কষ্টকর। কোনোটাই আপনি ছাড়তে পারবেন না। কি ফুটবল, কি সন্তান—দুটোই যে জীবন। জীবনকে উপভোগ করতে চাইলে আপনার অতীতের বেশ কিছু ঘটনা ভুলে যেতে হবে। সেই ঘটনাগুলোয় আপনি হয়তো ছিলেন অন্যদের মতন; নিজেকে নিয়েই ছিল আপনার সব ব্যস্ততা আর সব ধান্দা। আপনার সব শক্তি অন্য সব সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করার মহান দীক্ষা নিতে হবে। সেই দীক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে না পারলেও চেষ্টা করতে দোষ কী? সেই চেষ্টাটা সব সময়ই জাদুর মতোই অবিশ্বাস্য হয়। যতক্ষণ নিজেকে মানুষের ভালো করার জন্য বদলাতে পারবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই চেষ্টা মনে হবে অলৌকিক কোনো গল্প। সূত্র: ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের এস্কোয়ার ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান বেড়ে ওঠার দিনগুলো শুনলাম, আমি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরোপুরি বাঁদর হয়ে গেছি। আমার বাঁদরজীবনের সমাপ্তি ঘটানোর জন্যই আমাকে নাকি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে। আমার প্রথম স্কুলে যাওয়া উপলক্ষে একটা নতুন খাকি প্যান্ট কিনে দেওয়া হলো। সেই প্যান্টের কোনো জিপার নেই। সারাক্ষণ হা হয়ে থাকে। অবশ্যি তা নিয়ে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না। নতুন প্যান্ট পরছি—এই আনন্দেই আমি আত্মহারা। মেজো চাচা আমাকে কিশোরীমোহন পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন এবং হেড মাস্টার সাহেবকে বললেন, চোখে চোখে রাখতে হবে। বড়ই দুষ্ট। আমি অতি সুবোধ বালকের মতো ক্লাসে গিয়ে বসলাম। মেঝেতে পাটি পাতা। সেই পাটির ওপর বসে পড়াশোনা। ছেলেমেয়ে সবাই পড়ে। মেয়েরা বসে প্রথম দিকে, তাদের পেছনে ছেলেরা। আমি খানিকক্ষণ বিচার-বিবেচনা করে সবচেয়ে রূপবতী বালিকার পাশে ঠেলেঠুলে জায়গা করে বসে পড়লাম। রূপবতী বালিকা অত্যন্ত হৃদয়হীন ভঙ্গিতে তুই তুই করে সিলেটি ভাষায় বলল, এই তোর প্যান্টের...। ক্লাসের সব কটা ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হেসে উঠল। মেয়েদের আক্রমণ করা অনুচিত বিবেচনা করে সবচেয়ে উচ্চ স্বরে যে ছেলেটি হেসেছে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। হাতের কনুইয়ের প্রবল আঘাতে রক্তারক্তি ঘটে গেল। দেখা গেল ছেলেটির সামনের একটি দাঁত ভেঙে গেছে। হেড মাস্টার সাহেব আমাকে কান ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দিলেন—এ মহা গুন্ডা। তোমরা সাবধানে থাকবে। খুব সাবধান। পুলিশের ছেলে গুন্ডা হওয়াই স্বাভাবিক। ক্লাস ওয়ান ১২টার মধ্যে ছুটি হয়ে যায়। এই দুই ঘণ্টা আমি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সময়টা যে খুব খারাপ কাটল, তা নয়। স্কুলের পাশেই আনসার ট্রেনিং ক্যাম্প। তাদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। লেফট রাইট, লেফট রাইট। দেখতে বড়ই ভালো লাগছে। মনে মনে ঠিক করে ফেলাম, বড় হয়ে আনসার হব। ক্লাসের দ্বিতীয় দিনেও শাস্তি পেতে হলো। মাস্টার সাহেব অকারণেই আমাকে শাস্তি দিলেন। সম্ভবত প্রথম দিনের কারণে আমার ওপর রেগে ছিলেন। তিনি মেঘস্বরে বললেন, গাধাটা মেয়েদের সঙ্গে বসে আছে কেন? অ্যাই, তুই কান ধরে দাঁড়া। দ্বিতীয় দিনেও সারাক্ষণ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার, তৃতীয় দিনেও একই শাস্তি। তবে এই শাস্তি আমার প্রাপ্য ছিল। আমি একটা ছেলের স্লেট ভেঙে ফেললাম। ভাঙা স্লেটের টুকরায় তার হাত কেটে গেল। আবার রক্তপাত, আবার কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি। আমি ভাগ্যকে স্বীকার করে নিলাম। ধরেই নিলাম যে স্কুলের দু ঘণ্টা আমাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আজকের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি সত্যি আমাকে পাঠশালার প্রথম শ্রেণিটি কান ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাটাতে হয়েছে। তবে আমি একা ছিলাম না, বেশির ভাগ সময় আমার সঙ্গী ছিল শংকর। সে খানিকটা নির্বোধ প্রকৃতির ছিল। ক্লাসে শংকর ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু জুটল না। সে আমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে রইল। আমি যেখানে যাই, সে আমার সঙ্গে আছে। মারামারিতে সে আমার মতো দক্ষ নয়, তবে মারামারির সময় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আঁ-আঁ ধরনের গরিলার মতো শব্দ করে প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে যেত। এতেই অনেকের পিলে চমকে যেত। শংকরকে নিয়ে শিশুমহলে আমি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করে ফেলি। এই সময় স্কুলে কিছুদিনের জন্য কয়েকজন ট্রেনিং স্যার এলেন। ট্রেনিং স্যার ব্যাপারটা কী আমরা কিছুই জানি না। হেড স্যার শুধু বলে গেলেন, নতুন স্যাররা আমাদের কিছুদিন পড়াবেন। দেখা গেল, নতুন স্যাররা বড়ই ভালো। পড়া না পারলেও শাস্তি দেওয়ার বদলে মিষ্টি করে হাসেন। হইচই করলেও ধমকের বদলে করুণ গলায় চুপ করতে বলেন। আমরা মজা পেয়ে আরও হইচই করি। একজন ট্রেনিং স্যার, কেন জানি না, সব ছাত্রছাত্রীকে বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে পড়লেন। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করেন। আমার যা মনে আসে বলি আর উনি গম্ভীর মুখে বলেন, তোর এত বুদ্ধি হলো কী করে? বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। তোর ঠিকমতো যত্ন হওয়া দরকার। তোকে নিয়ে কী করা যায় তাই ভাবছি। কিছু একটা করা দরকার। কিছু করার আগেই স্যারের ট্রেনিংকাল শেষ হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন। তবে কেন জানি কিছুদিন পরপরই আমাকে দেখতে আসেন। গভীর আগ্রহে পড়াশোনা কেমন হচ্ছে তার খোঁজ নেন। সব বিষয়ে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়ে ক্লাস টুতে ওঠার সংবাদ পাওয়ার পর স্যারের উৎসাহে ভাটা পড়ে যায়। শুধু যে উৎসাহে ভাটা পড়ে তা-ই না, উনি এতই মন খারাপ করেন যে আমার নিজেরও খারাপ লাগতে থাকে। ক্লাস টুতে উঠে আমি আরেকটি অপকর্ম করি। যে রূপবতী বালিকা আমার হৃদয় হরণ করেছিল, তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করি, বড় হয়ে সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না। প্রকৃতির কোনো এক অদ্ভুত নিয়মে রূপবতীরা শুধু যে হৃদয়হীন হয় তা-ই না, খানিকটা হিংস্র স্বভাবেরও হয়। সে আমার প্রস্তাবে খুশি হওয়ার বদলে বাঘিনীর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খামচি দিয়ে হাতের দু-তিন জায়গার চামড়া তুলে ফেলে। স্যারের কাছে নালিশ করে। শাস্তি হিসেবে দুই হাতে দুটি ইট নিয়ে আমাকে নিল ডাউন হয়ে বসে থাকতে হয়। প্রেমিক পুরুষদের প্রেমের কারণে কঠিন শাস্তি ভোগ করা নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে আমার মতো এত কম বয়সে প্রেমের এমন শাস্তির নজির বোধ হয় খুব বেশি নেই। স্কুল আমার ভালো লাগত না। মাস্টাররা অকারণে কঠিন শাস্তি দিতেন। পাঠশালা ছুটির পর বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছে, এ ছিল প্রাত্যহিক ঘটনা। আমাদের পাঠশালায় প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা। কিন্তু একটা ক্লাস থেকে অন্য ক্লাস আলাদা করা নয়, অর্থাৎ কোথাও কোনো পার্টিশনের ব্যবস্থা নেই। কোনো ক্লাসে একজন শাস্তি পেলে পাঠশালার সবাই তা দেখে বিমলানন্দ ভোগ করত। আমার জীবনে শিক্ষকেরা এসেছেন দুষ্টগ্রহের মতো। আমি সারা জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি—আইসক্রিমওয়ালা, জুতা পলিশওয়ালা থেকে ডাক্তার, ব্যারিস্টার কিন্তু কখনো শিক্ষক হতে চাইনি। চাইনি বলেই বোধ হয় এখন জীবন কাটাচ্ছি শিক্ষকতায়। থ্রি থেকে ফোরে উঠব। বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। বাড়িতে বাড়িতে পড়াশোনার ধুম। আমি নির্বিকার। বই নিয়ে বসতে ভালো লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেই বসাটা পুরোপুরিই ভান। সবাই দেখল, আমি বই নিয়ে বসে আছি, এই পর্যন্তই। তখন প্রতি সন্ধ্যায় সিলেট শহরে মজাদার ব্যাপার হতো—তার নাম ‘লেমটন লেকচার’। কথাটা বোধ হয় ‘লন্ঠন লেকচার’-এর বিকৃত রূপ। ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে জায়গায় জায়গায় সিনেমা দেখায়: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ম্যালেরিয়া এইসব ভালো ভালো জিনিস। আমাদের কাজের ছেলে রফিক খোঁজ নিয়ে আসে আজ কোথায় লেমটন লেকচার হচ্ছে—মুহূর্তে আমরা দুজন হাওয়া। রফিক তখন আমার বন্ধুস্থানীয়। লেমটন লেকচারের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামানোর অনেক চেষ্টা করা হলো। নামান গেল না। মা হাল ছেড়ে দিলেন। এখন আর সন্ধ্যা হলে পড়তে বসতেও বলেন না। আমি মোটামুটি সুখে আছি বলা চলে। এমন এক সুখের সময়ে মাথামোটা শংকর খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, তার মা তাকে বলেছেন সে যদি ক্লাস থ্রি থেকে পাস করে ফোর-এ উঠতে পারে, তাহলে তাকে ফুটবল কিনে দেবেন। সে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্য। কী করে এক ধাক্কায় পরের ক্লাসে ওঠা যায়। একটা চামড়ার ফুটবলের আমাদের খুবই শখ। সেই ফুটবল এখন মনে হচ্ছে খুব দূরের ব্যাপার নয়। সেই দিনই পরম উৎসাহে শংকরকে পড়াতে বসলাম। যে করেই হোক তাকে পাস করাতে হবে। দুজন একই ক্লাসে পড়ি। এখন সে ছাত্র, আমি শিক্ষক। ওকে পড়ানোর জন্য নিজেকে প্রথম পড়তে হয়, বুঝতে হয়। যা পড়াই কিছুই শংকরের মাথায় ঢোকে না। মনে হয় তার দুই কানে রিফ্লেকটর লাগান। যা বলা হয় সেই রিফ্লেক্টরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, ভেতরে ঢুকতে পারে না। যাই হোক, প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হলো। দুজন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল, আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সমস্ত শিক্ষককে স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম। এই ক্ষুদ্র ঘটনা বাবাকে খুব মুগ্ধ করল। বাসায় যে-ই আসে বলেন, আমার এই ছেলের কাণ্ড শুনুন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছে। কারণ হলো...। এই ঘটনার আরেকটি সুফল হলো, বাবা মাকে ডেকে বলে দিলেন—কাজলকে পড়াশোনা নিয়ে কখনো কিছু বলার দরকার নেই। ও ইচ্ছা হলে পড়বে, ইচ্ছা না হলে না। তাকে নিজের মতো থাকতে দাও। আমি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম। এই আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ, বিশেষ বিবেচনায় মাথামোটা শংকরকে প্রমোশন দিয়ে দেওয়া হলো। তার মা সেই খুশিতে তাকে একটা এক নম্বরি ফুটবল এবং পাম্পার কিনে দিলেন। গ্রিন বয়েজ ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হলো। আমি ক্লাবের প্রধান এবং শংকর আমার অ্যাসিসটেন্ট। আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক আমাদের ফুলব্যাক। অসাধারণ খেলোয়াড়। (নির্বাচিত অংশ) সূত্র: আমার ছেলেবেলা, হুমায়ূন আহমেদ। আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়ায়, কাকলী প্রকাশনী, ২০০২ ফুটবল আমার ধ্যানজ্ঞান : লিওনেল মেসি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার আজেন্টিনার লিওনেল মেসি। জন্ম আর্জেন্টিনায়, ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। বিশ্বসেরার স্বীকৃতিস্বরূপ মেসি চারবার ফিফা ব্যালেন ডি’অর সম্মাননা লাভ করেন। তখন আমি বেশ ছোট। জন্মদিনের এক উপহার পেয়ে আমি চমকে যাই। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমার এক আত্মীয় আমার হাতে ভিন্ন এক জীবন উপহার দেয়—এক নতুন ফুটবল। তিন কিংবা চার বছর বয়সে পাওয়া সেই উপহারের জন্য আজ আমি এখানে। সেই উপহার আমার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে বড়দিন কিংবা জন্মদিন সব সময়ই উপহার হিসেবে আমার চাওয়া ছিল ফুটবল। খুব সাধারণ এক ফুটবলপাগল পরিবারে ছিল আমার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা-চাচাদেরও ছিল ফুটবল নিয়ে ভীষণ মাতামাতি। বাবা তো এক ফুটবল ক্লাবের কোচের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুলে যেতাম। সেখান থেকে ফিরেই মুখে কিছু একটা পুরে রাস্তায় ফুটবল খেলতে ছুটতাম। আমি সৌভাগ্যবান আমার সাধারণ পরিবারের জন্য। বাবার দিনভর পরিশ্রমই ছিল আমাদের একমাত্র রুজি। তিন ভাইয়ের জন্য ছিল বাবা-মায়ের সব আদর। ছোটবেলায় আমি বেশির ভাগ সময়ই রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। বাড়ির বাইরে যেখানেই সুযোগ পেতাম, সেখানেই খেলতাম। সত্যি বলতে কি, পাঁচ বছর বয়স থেকে ফুটবল আমার বন্ধু। পাড়ার বড় ভাইয়েরা রাস্তার ফুটবল ম্যাচে আমাকে নিতে চাইত না। আমার কাছ থেকে যখন বল নিতে পারত না, তখন তারা আমাকে দুষ্টুমি করে মারধর করতে চাইত। রাস্তার ওপর আমার ফুটবল খেলা নিয়ে আমার ভাই ভীষণ দুশ্চিন্তা করতেন। রোজিওতে আমার জন্ম। সেই এলাকার ছোট ফুটবল ক্লাব গ্র্যান্ডোলিতে আমাদের পুরো পরিবারের সবাই বয়স অনুসারে সেই ক্লাবে খেলতাম। মা–ই থাকত শুধু খেলার বাইরে। আমরা প্রতি রোববার সারা দিন ক্লাবের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতাম। মা-দাদিও ছিলেন সেই ক্লাবের পাড় সমর্থক। বাবা তখন ক্লাবে কোচিং করাতেন, তিনিই আমার প্রথম কোচ। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস করতাম। সেই রাস্তা, সেই স্মৃতি, সেই সময়—সব আমার বদলে যায় খুব ছোট থাকতেই। স্পেনের বার্সেলোনায় আসার পরেই আমার সব পাল্টে যায়। ফুটবল খেলার বন্ধু, স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠী, পরিবার এবং নিজের দেশ ছেড়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক মহাসাগর দূরে চলে আসি। এটা ছিল আমার জন্য ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা। একদিকে বার্সেলোনা থাকার নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ছিল বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট। প্রথম প্রথম অনেক মন খারাপ হতো। একা একা লাগত। কান্নাকাটি করতাম অনেক সময়। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিতাম। ধীরে ধীরে আমি নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করি। আমার স্বপ্ন ছিল বার্সেলোনার মূল দলে ফুটবল খেলা। আমার জীবনের সবকিছু শিখেছি আমি বার্সেলোনাতে এসে। এখানেই আমি বড় হই, লেখাপড়াও এখানকার স্কুলে। কিশোর বয়স থেকেই ফুটবল আমার ধ্যান-জ্ঞান। আমি ছোটবেলায় যেভাবে খেলতাম, এখনো সেভাবে খেলি। আমার খেলার ঢং একই রকম। আমি নিজের মতো খেলে যাই। বার্সেলোনাতে খেলে আমি ফুটবল নিয়ে অনেক কৌশল শিখতে পেরেছি। কিশোর বয়সে প্রথমদিকে খেলার সময় ফুটবল কোচ ফ্যাবিও কাপেলো আমাকে ‘ছোট শয়তান’ তকমা দিয়েছিলেন। আমার জন্য সেটা ছিল খুবই আনন্দের। তিনি ফুটবল কোচ, তাঁর কাছ থেকে এত ছোট বয়সে প্রশংসা পাওয়া নিশ্চয়ই দারুণ ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগত সম্মাননা কিংবা নিজে বেশি গোল করতে আগ্রহী নই। আমি আমার দলের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কারটাই আনতে চাই। আমি পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হওয়ার চেয়ে একজন ভালো মানুষ হতেই বেশি আগ্রহী। কারণ, সবশেষে আমি যখন অবসরে যাব, তখন প্রত্যাশা থাকবে সবাই যেন আমাকে বিনয়ী হিসেবেই চেনে। আমি গোল করতে পছন্দ করি কিন্তু বন্ধুত্ব করতেও আগ্রহী বেশি। দলের ফুটবলাররা আমার বন্ধু। তাঁদের ছাড়া আমি তো আসলে শূন্য। আমি হারতে ভীষণ অপছন্দ করি। সেটা বাস্তব জীবনেও। দরিদ্রতা আমাকে রাগায়। আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে দারিদ্র্যই বাস্তবতা। সেখানে অনেক শিশু আছে, যাদের বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করতে হয়। অন্য কিছু করার উপায় নাই বলে অনেক কম বয়সে কাজে করতে হয়। আমি বার্সেলোনাতে একটু ভালো পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছি। বাবার সঙ্গে থাকার সুযোগ পাই। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন। অনেক বাবা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তাঁদের সন্তানকে বড় করতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তথ্যসূত্র: এল পাই্যজ (২০১২) এবং ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনে (২০১৩) দেওয়া মেসির সাক্ষাৎকার। মেসি লেখাটি লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান আমার জীবনটাই যেন সিনেমা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা৷ জন্ম ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জেতে। ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোলের একটি ‘গোল অব সেঞ্চুরি’র মর্যাদা পায়, আর অন্যটি ‘হ্যান্ড অব গড’ হিসেবে ব্যাপক আলোচিত। ফিফার বিশ শতকের সেরা ফুটবলারের তালিকায় তিনি ও ব্রাজিলের পেলে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেন৷ মাঝেমধ্যে আমি চিন্তা করি, আমার পুরো জীবনই যেন এক সিনেমা৷ সিনেমার রিলে যেন আমার জীবনের সব ছবি ধারণ করে রাখা আছে৷ সবাই ছোটবেলায় বিখ্যাত কাউকে অনুসরণ করে৷ আমার ছোটবেলায় আর্জেন্টিনায় সত্যিকারের বিখ্যাত অনুকরণীয় ফুটবলার কেউ ছিল না৷ ফুটবল ছিল তখন আর্জেন্টিনার গরিব আর বস্তিতে থাকা ছেলেদের মুক্তির একটা বড় উপায়৷ দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচতে আমরা ফুটবলকে বেছে নিতাম৷ বুয়েনস এইরেসে আমরা খুব ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকতাম৷ ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে যেত৷ আমার বয়স যখন তিন, তখন আমার এক কাজিন আমাকে একটা চামড়ার বল উপহার দেয়৷ সেটাই ছিল আমার প্রথম বল৷ আমি সেই বলটিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতাম। আমার বাড়ির পেছনেই ছিল চতুর্থ লিগের এক ফুটবল দলের স্টেডিয়াম৷ আমি সারা দিন এলাকার আনাচকানাচে ফুটবল খেলতাম৷ সন্ধ্যায় অন্য সব ছেলেপেলে বাড়ি ফিরে গেলে আমি আরও খেলতাম৷ অন্ধকার হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরও আমার পায়ে ফুটবল থাকত৷ অন্ধকারে আমি চোখে কিছুই দেখতাম না৷ সে জন্য আমি শুধু সামনের দিকে বল কিক করে যেতাম৷ আমি দুটি কাঠি দিয়ে গোলপোস্ট বানাতাম৷ অন্ধকারে সেই গোলপোস্টের অদৃশ্য জালে কিকের পর কিক করে যেতাম৷ এর বছর দশেক পর, যখন আমি প্রথম ক্লাব আর্জেন্টিনো জুনিয়র্সের হয়ে চুক্তি করি, তখন বুঝেছিলাম অন্ধকারে সেই ফুটবলচর্চা আমার কত কাজে লেগেছে৷ আমার প্রথম আয় করা টাকা দিয়ে আমি এক জোড়া ট্রাউজার কিনেছিলাম৷ আমার জন্ম বুয়েনস এইরেসের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অংশ ফ্যাবেল ফিওরিটোতে৷ সেই অঞ্চলের দারিদ্রের মাত্রা আর আমার ছোটবেলার বন্ধুরা এখনো সেই আগের মতোই আছে৷ শুধু রাজনীতিবিদ আর সরকারি লোকেরাই দিনকে দিন ধনী হচ্ছে৷ আমার সামনেও ধনী হওয়ার অনেক সুযোগ ছিল৷ কিন্তু আমি সেই সুযোগকে ‘না’ করে দিই৷ আমার ‘না’ বলার পেছনে যুক্তি ছিল, আমাকে ধনী হতে হলে গরিবের কাছ থেকে চুরি করতে হবে৷ আমি একবার গরিবদের কথা বলার জন্য আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ আমার একটি কথাও শোনেনি৷ আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল কিংবা কিউবা সব জায়গাতেই একই সমস্যা—দারিদ্র। ধনী দেশগুলো জন্য আমাদের এই দীনতা৷ এটা সত্য, কোনো কিছু বদলে দেওয়া বেশ কষ্টকর৷ কিন্তু এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা সেই কুশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে জানি৷ কেউ গরিবদের পক্ষে কথা বলে না৷ সেটা স্বয়ং পোপ থেকে শুরু করে সব দেশের রাজনীতিবিদেরা৷ বার্লিন ওয়াল ধ্বংসের পরে সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে নয় গুণ৷ এদের দেখার কেউ নেই৷ আমি সব সময় আমার বাবার কথা মনে আনি৷ বাবা যখন কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতেন, আমরা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷ আট সন্তানের জন্য তিনি বেশি কিছু আয়ও করতে পারতেন না৷ আমরা চুপ করে বাড়িতে বসে থাকতাম৷ আমাদের কোনো খাবার থাকত না৷ আমাদের কষ্ট কেউ বুঝবে না৷ আপনি যদি ক্ষুধার্ত না হন, তাহলে আমার কষ্ট বুঝতে পারবেন না৷ আমার বোন কম খেত, যেন আমি রাতের বেলায় বেশি খেতে পারি৷ এমন পরিস্থিতিতে আপনার অন্য মানুষের প্রতি মায়া, মমতা আর ভালোবাসা তৈরি হবে৷ আমার মা পেটব্যথার ভান ধরে কিছু খেতেন না৷ তিনি সেই খাবার তাঁর সন্তানদের জন্য রেখে দিতেন৷ পাত্রের শেষ দানাটুকু পর্যন্ত তিনি আমাদের দিয়ে দিতেন৷ এই কষ্ট নিয়েই আমার বেড়ে ওঠা৷ আমার মা আমাকে মিথ্যা বলে খাওয়াতেন৷ কেউ কেউ একে কল্পকাহিনি বলে উড়িয়ে দেয়৷ কিন্তু আমার কাছে দরিদ্রতাই সত্য, বাস্তবতা৷ আমি সেসব কষ্টের সময়ের কথা ভুলিনি৷ আমি যে ভুলতে পারব না৷ আমার বাবা কাভানটাকা মার্কেটে কাজ করতেন৷ তিনি সব সময় ভারী ব্যাগ বহন করতেন৷ বৃদ্ধ বয়সেও তিনি ঘাড়ে ব্যাগ টানতেন৷ বাবা যখন বাড়ি ফিরতেন, তাঁর পিঠ আর ঘাড়ে বরফের ব্যাগ রেখে দিতেন মা৷ আমরা ভাইবোনেরা অবাক হয়ে তা দেখতাম৷ আমি ছোটবেলায় কখনো জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে পারতাম না৷ আমাদের কখনোই টাকাপয়সা হাতে থাকত না৷ জন্মদিনে আমার পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন আমার গালে চুমু দিত৷ সেই চুমুই ছিল আমার জন্য বড় উপহার৷ আমি ম্যারাডোনা, যে কিনা গোল করতে পারে, আবার ভুল করতে জানে৷ আমি সব বাধা নিজের মতো করে লড়তে জানি৷ আমার মা সব সময় চিন্তা করতেন আমিই সেরা৷ নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাই সবচেয়ে কঠিন শ্রমের কাজ৷ আমি ছোটবেলা থেকে আমার মায়ের বিশ্বাসকে শক্তভাবে ধারণ করেছি৷ ফুটবল মাঠে বলে পেছনে দৌড়ানোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের স্মৃতি৷ সমালোচকেরা আমার নামে অনেক কিছুই বলে৷ কিন্তু কেউ বলতে পারবে না আমি ঝুঁকি নিতে পারি না৷ ম্যারাডোনার আত্মজীবনী এল ডিয়েগো ও সার্বিয়ান সংবাদপত্র পলিটিকায় দেওয়া ম্যারাডোনার সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান আমি ফুটবল জাদুকর নই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার পেলে৷ ১৯৪০ সালে ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেন ফুটবলের এই মহাতারকা৷ ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য তিনি৷ ফুটবলে বর্ণবাদ বিলোপে ফিফার দূত ও ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন৷ ছয় বছর বয়সে আমি প্রথম ফুটবলে কিক করি৷ সেদিন ছিল আমার জন্মদিন৷ এ জন্য আমার বাবার ফুটবলার বন্ধু সোসা আমাকে একটি চামড়ার বল উপহার দেন৷ সেটিই ছিল আমার সত্যিকারের কোনো বলে লাথি মারার অভিজ্ঞতা৷ তার আগে আমরা মোজার মধ্যে কাগজ ভরে ফুটবল বানিয়ে খেলতাম৷ আমাকে অনেকে জাদুকর ভেবে ভুল করে৷ আমি আসলে জানি না কেন তারা ভুল করে৷ এটা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন৷ কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ফুটবলের জন্যই আমাকে সবাই চেনে৷ ফুটবল ছাড়া আমার অস্তিত্ব শূন্য৷ ফুটবল একটি পরিবারের মতন, বিশ্বপরিবার৷ এটা কোনো ছোটখাটো পরিবার নয়, সারা বিশ্বই ফুটবল পরিবার৷ আমি এই পরিবারের জন্য কাজ করে যাই৷ আমি সব সময় চেষ্টা করি অন্যের মঙ্গল করতে৷ আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে অন্যকে খুশি রাখার৷ আমি আগে পা দিয়ে ফুটবল খেলতাম, এখন হৃদয় দিয়ে খেলি৷ আমি ইউনেসকোর হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করি৷ আমি সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টায় থাকি সব সময়৷ আমার ফুটবল খেলার অনুপ্রেরণা অনেকে৷ তারুণ্যে অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার বাবা দোনদিনহো আর ব্রাসিলিয়ার মধ্যমাঠের ফরোয়ার্ড জিজিনহো৷ আমার চোখে তিনি ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার৷ মিশেল প্লাতিনি, বেকেনবাওয়ার অসাধারণ ফুটবলার ছিলেন৷ লেভ ইয়াসিন ছিলেন অনন্য এক গোলরক্ষক৷ ফুটবল মাঠে ক্রুইফ, ডি স্টেফানো, জিকো যাঁর যাঁর দিনে হয়ে উঠতেন ভয়ংকর৷ ম্যারাডোনাও ফুটবলের মাঠে দুর্জেয়৷ জর্জ বেস্ট তো ইউরোপ কাঁপানো ফুটবলার৷ ফুটবল আমাকে সব দিয়েছে—খ্যাতি, সম্মান, অর্থ৷ এখন আমি ফুটবলকে দিতে চাই৷ আমি মানুষকে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা ফেরত দিতে পারব না৷ কিন্তু তার পরও আমি তাদের কিছু দিতে চাই৷ আমি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই৷ এখন যারা শিশু, আমি তাদের ‘হ্যালো’ বলে ডাক দিই৷ এতে তারা যতটা খুশি হয়, আমি তার চেয়েও বেশি খুশি হই৷ আমি পেশাদার ফুটবল ছেড়েছি ৩০ বছর আগে৷ এখন যারা আট বছর, পঁাচ বছরের শিশু, আমাকে বিমানবন্দরে দেখলে চিৎকার করে ওঠে, ‘মা, দেখো, পেলে!’, ‘বাবা, দেখো, ওই যে পেলে!’ এটা নিঃসন্দেহে অন্য রকম একটি অনুভূতি৷ আমার জন্য এটাই তো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ উপহার৷ আমি ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের জন্মগ্রহণ করি৷ আমার নাম অনেক লম্বা! এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো—একবার বলা শুরু হলে আর শেষ হয় না; যদিও আমার এত বড় নাম ছোটবেলা থেকে কখনোই পছন্দের ছিল না৷ আমার নামকরণ করা হয় বিখ্যাত উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী থমাস এডিসনের নাম থেকে৷ আমার বাবা ভালো ফুটবলার ছিলেন৷ তিনি সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলতেন৷ তাঁর ঝুলিতে অনেকগুলো গোলও ছিল৷ আমি ছোটবেলা থেকে চাইতাম বাবার মতো হতে৷ কিন্তু একটা ইনজুরি বাবার খেলা বন্ধ করে দেয়৷ আমি শহরের শিশু-কিশোরদের সঙ্গে অনেকটা সময় ফুটবল খেলেছি৷ তাদের কেউ একজন আমাকে ‘পেলে’ বলে ডাকত৷ আমি প্রতিবাদ করতাম, ‘না, পেলে না, আমাকে পেলে নামে ডেকো না৷ আমার নাম এডসন৷’ যারা আমার ভুল নামে ডাকত, আমি তাদের সঙ্গে মারামারি করতে ছুটতাম৷ আমার স্কুলেও একই ঘটনা ঘটত৷ আমাকে পেলে নামে সবাই খ্যাপাত৷ আমি সেখানেও মারামারি করতাম৷ আমাকে স্কুল থেকে দুদিনের জন্য বহিষ্কার করা হয়৷ আমার মা-বাবাকে স্কুলে ডাকা হয়৷ আমি তাঁদের বলি, ‘আমাকে পেলে নামে সবাই ডাকে বলে আমি মারামারি করেছি৷ আমি এই বাজে নাম পছন্দ করি না৷ আমার নাম এডসন৷’ এর পরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠল৷ আমাকে সবাই ‘পেলে–পেলে–পেলে’ বলে ডাকা শুরু করল! অনেক সাংবাদিক আমার নামের অর্থ খুঁজতে উদ্গ্রীব৷ পেলে নামের অর্থ কী? তারা আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে, কিন্তু নামের অর্থ বের করতে পারেনি৷ শেষ পর্যন্ত তারা ‘মাদাম পেলে’ নামে এক আগ্নেয়গিরি খুঁজে পায়৷ ব্রাজিলে অনেক ফুটবলারের মধ্যে একজন গোলরক্ষক আমার বাবার বন্ধু ছিলেন৷ তাঁর নাম ছিল ‘বিলে’৷ আমার ধারণা, তাঁর নামের বিকৃত উচ্চারণেই আমার নাম৷ স্রষ্টা ভালো জানেন, আমি জানি না৷ প্রথম বিশ্বকাপে খেলা ছিল অনন্য এক অভিজ্ঞতা৷ এটা ছিল স্বপ্নের মতন৷ প্রথম ম্যাচে গোল করার পরে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল৷ তার পরের সময়টুকু ইতিহাস৷ ফরাসিদের বিপক্ষে আমি তিন গোল করি আর ফাইনাল খেলা ছিল বিস্ময়কর স্বপ্ন! বিশ্বকাপ জয় ছিল আমার জন্য বিশেষ একটি ঘটনা৷ আত্মবিশ্বাস থাকলে কেউ কাউকে দমিয়ে রাখতে পারে না৷ আমার বাবা আমাকে বলতেন, ‘স্রষ্টা তোমাকে ফুটবল খেলার অনন্য দক্ষতা দিয়েছেন৷ এটা তাঁর উপহার৷ আত্মবিশ্বাস রেখে সেই উপহার কাজে লাগাও৷’ সূত্র: এনটিভি নেটওয়ার্কসের গ্লোবাল লিডার্স অনুষ্ঠান, জিকিউ ম্যাগাজিন ও ফোরফোরটু’কে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে জাহিদ হোসাইন খান সফল ড্রপআউট! জেমস ক্যামেরন চলচ্চিত্রকার ‘টাইটনানিক’খ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা জেমস ক্যামেরন জীবন দুই-দুইবার ড্রপআউট হয়েছেন। ১৯৭১ সালে পরিবার কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালে তিনি ১৭ বছর বয়সে লুথেরান হাইস্কুল অব অরেঞ্জ কাউন্টিতে ভর্তি হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নাম কাটা পড়ে তাঁর। এর পরে ট্রয় হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিকের বাকি পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ১৯৭৩ সালে জেমস ক্যালিফোর্নিয়ার ফুলারটন কলেজে ভর্তি হন। প্রথমে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার জন্য নাম লেখালেও পরবর্তী সময়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু এক বছর হওয়ার আগেই কলেজ পালান তিনি। কলেজ ছেড়ে নানান কাজে হাত পাকিয়ে শেষ পর্যন্ত সিনেমা জগতে চলে আসেন। লেডি গাগা সংগীতশিল্পী কনভেন্ট অব স্কেয়ার্ড হার্ট নামের রোমান ক্যাথলিক স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী অ্যাঞ্জেলিনা। বই পড়তে যেমন আগ্রহ, তেমনি পিয়ানো বাজানোতে আগ্রহ তাঁর সমান। হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীতবিষয়ক এক বৃত্তি পান। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে গান লেখা আর গাওয়াতেই আগ্রহ বাড়ে তাঁর। দ্বিতীয় সেমিস্টারে এসেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। বাবার আপত্তি ছিল। মেয়ে বাবাকে শর্ত দিয়েছিলেন ‘সংগীতে ক্যারিয়ার না বানাতে পারলে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন।’ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া সেই অ্যাঞ্জেলিনা এখন তরুণদের কাছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লেডি গাগা। টাইগার উডস গলফ খেলোয়াড় ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়েস্টার্ন হাইস্কুলে পড়ার সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সে ইউএস জুনিয়র অ্যামেচার গলফ চ্যাম্পিয়ন হন টাইগার উডস। গলফের অসিলায় বৃত্তি নিয়ে হাইস্কুল পাস করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। অর্থনীতি বিষয়ে পড়া শুরু করেন। কিন্তু মাত্র দু বছরেই রণে ক্ষান্ত দেন। পড়াশোনার পাট না চুকিয়েই পেশাদার গলফার হয়ে ব্যস্ত জীবন শুরু করে দেন টাইগার। অত:পর বিশ্বসেরা গলফার। সূত্র: টাইম মাগাজিন অনলাইন সব মানুষই জাদুকর অস্কার, এমি, গোল্ডেন গ্লোব, গ্র্যামি পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন অভিনেতা, স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামস। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। কদিন আগে (১১ আগস্ট ২০১৪ সালের) তিনি লোকান্তরিত হন। আমার জন্ম শিকাগোতে। আমাদের নিজেদের কোনো বাড়ি ছিল না। কিন্তু আমরা অনিন্দ্যসুন্দর এক ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। আমার অতীতটা ছিল অনেক সুন্দর। আবার যদি সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম। ইশ্! ব্যক্তি আমি যা, তার সবটুকুই এসেছে বাবার জিন থেকে। আর বাবা ছিলেন ভীষণ যৌক্তিক, শান্তশিষ্ট কিন্তু শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। প্রত্যেক সন্তানের কাছে তাদের বাবা সুপার হিরো। আমার বাবাও। কমেডিয়ান হিসেবে আমার সব গুণ পেয়েছি মায়ের কাছ থেকে। মা সব সময় বলতেন, পৃথিবীতে সীমানা বলে কিছু নেই। আমার মা ছিলেন চমৎকার এক নারী, তাঁর মতো আদুরে আর ভালো মানুষ আমি পৃথিবীতে দেখিনি। মা সব মানুষের মঙ্গলে বিশ্বাস করতেন। যেই বিশ্বাস পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর বিশ্বাস বলে মনে হয় আমার। একবার আমি গায়ক বব ডিলানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ডিলান আমাকে অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন করে বিব্রত করে দিয়েছিল। আমিও কম যাই না, আমিও কঠিন উত্তর দিয়ে তাকে ভড়কে দিই। ডিলান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অন্য কারও মস্তিষ্ক বেছে নিতে চাইলে কারটা নেব?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘কয়েক ঘণ্টার জন্য স্টিফেন হকিংয়ের মাথা পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু আমি সব সময়ের জন্য আইনস্টাইনের মাথাটাই বেছে নেব।’ আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় তিনটি সংগ্রহের বস্তু হলো: আইনস্টাইনের অটোগ্রাফ, বাবার দেওয়া একটা ছুরি আর পাথরের তৈরি ছোট একটা মূর্তি। আরেকটি বস্তু আমার খুব প্রিয়, আমার দাদার ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা দিয়ে দাদা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে ছবি তুলতেন। অভিনেতা না হলে মনে হয় আমি কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়েই পড়াশোনা করে পেট চালাতাম। আর কখনো ছবি বানানোর সুযোগ পেলে আমি আইজ্যাক আসিমভের দ্য ফাউন্ডেশনকে ভিত্তি করে সিনেমা বানাতাম। আমি ডিসকভারি চ্যানেলে আসক্ত। কুমিরদের কাজকর্ম আমাকে ভীষণ টানে। আমার কোনো সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে আমি তা কখনই পড়ি না। আমি ভয়ে পড়ি না। যদি নিজের সম্পর্কে খুব বাজে কিছু বলি থাকি! আমার নিজেকেই সবচেয়ে বড় ভয়। মানুষ হিসেবে আমরা নিজের ক্ষতি নিজেই সবচেয়ে বেশি করি। তাই পড়ি না। কখনো কোনো কিছু চুরি করার সুযোগ পেলে আমি পৃথিবীর সব পারমাণবিক বোমার নকশা চুরি করে নষ্ট করে ফেলতাম। সারা পৃথিবীতে যত সংঘাতের খবর পাই, সবই আমাকে কাঁদায়। আমি নিরুপায়, পৃথিবীর জন্য আমার কি কিছুই করার নেই? আমি সামান্য একজন কমেডিয়ান। আমার হাত-পা বাঁধা। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি স্টিফেন হকিংকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে সহায়তা করতাম। কিশোর বয়সে আমার ইচ্ছে করত লেওনার্দো দা ভিঞ্চির এজেন্ট হতে। আমি তাঁকে বকতে পারতাম, ‘লেওনার্দো, তুমি এখন কী করছ? অযথা সময় নষ্ট কেন করছ! তোমার কত কাজ বাকি!’ কিন্তু একটা সময় আমার কেন জানি মনে হতো, আমি যদি পেলে হতাম! তিনি বড়মাপের ফুটবলার। কখনো অবসর মিললে আমি বেটোফেনের পঞ্চম সুর কম্পোজ করার চেষ্টা করতাম। আমার জীবনটা মনে হয় দুই চাকার বাইসাইকেল। সাইকেলের মতো আমিও দুই পায়ে চলি, সোজা চলার চেষ্টা করি। আরেকটা জিনিস আমি খুব পছন্দ করি, তা হলো জাদু। হা করে আমি জাদু দেখি। আমার মনে হয়, মানুষই সবচেয়ে বড় জাদুকর। সবাই জাদুকর। সে সব পারে। যা ভাবে তা-ই করে, যা কল্পনা করে, তা-ই বাস্তবে আনতে পারে। আমিও একসময় জাদুকর ছিলাম। আমার ১৬ বছর বয়সের একটা ঘটনা সব সময় মনে পড়ে। সময়টা তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। একটা রোগাক্রান্ত ওক গাছ ভেঙে আমাদের এলাকার রাস্তা আটকে দেয়। আমি সেই সময়টাতে অন্যদের সঙ্গে মিলে গাছটা রাস্তা থেকে সরিয়ে দিই। আমি কেন সেই কাজ করেছিলাম, এখনো জানি না। শুধু জানি, সামনে বিপত্তি দেখা দিলে তা দুই হাত দিয়ে সরিয়ে দেওয়া যায়। জাদুর মতোই। যদি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কথা বলার সুযোগ পেতাম, তাহলে বেশি কিছু বলতাম না। আমি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের বলতাম, নিজেকে তৈরি করার জন্য যা দরকার, তাই কর। নিজেকে আগামীর জন্য তৈরি কর। বেঁচে থাকতে আমাদের সবার ছোটখাটো একটা রাইফেল লাগে, আর সেটা হলো জ্ঞান। যত পারো শেখো, শেখার কোনো শেষ নেই। সবকিছু জানার চেষ্টা করো। পচা মাংস থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়। সময়টা এখন হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের। নিজেকে তৈরি করতে হবে নিজেকেই। আর সেই সঙ্গে চুপ থাকতে শেখো। নিস্তব্ধতার মূল্য অমূল্য। আর সব সময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। তোমাকে বাছাই করতে হবে কীভাবে তুমি মরবে। তথ্যসূত্র: রবিন উইলিয়ামস ডট নেট অবলম্বনে ভাষান্তর করেছেন জাহিদ হোসাইন খান সব মানুষই জাদুকর অস্কার, এমি, গোল্ডেন গ্লোব, গ্র্যামি পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন অভিনেতা, স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামস। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। কদিন আগে (১১ আগস্ট ২০১৪ সালের) তিনি লোকান্তরিত হন। আমার জন্ম শিকাগোতে। আমাদের নিজেদের কোনো বাড়ি ছিল না। কিন্তু আমরা অনিন্দ্যসুন্দর এক ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। আমার অতীতটা ছিল অনেক সুন্দর। আবার যদি সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম। ইশ্! ব্যক্তি আমি যা, তার সবটুকুই এসেছে বাবার জিন থেকে। আর বাবা ছিলেন ভীষণ যৌক্তিক, শান্তশিষ্ট কিন্তু শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। প্রত্যেক সন্তানের কাছে তাদের বাবা সুপার হিরো। আমার বাবাও। কমেডিয়ান হিসেবে আমার সব গুণ পেয়েছি মায়ের কাছ থেকে। মা সব সময় বলতেন, পৃথিবীতে সীমানা বলে কিছু নেই। আমার মা ছিলেন চমৎকার এক নারী, তাঁর মতো আদুরে আর ভালো মানুষ আমি পৃথিবীতে দেখিনি। মা সব মানুষের মঙ্গলে বিশ্বাস করতেন। যেই বিশ্বাস পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর বিশ্বাস বলে মনে হয় আমার। একবার আমি গায়ক বব ডিলানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ডিলান আমাকে অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন করে বিব্রত করে দিয়েছিল। আমিও কম যাই না, আমিও কঠিন উত্তর দিয়ে তাকে ভড়কে দিই। ডিলান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অন্য কারও মস্তিষ্ক বেছে নিতে চাইলে কারটা নেব?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘কয়েক ঘণ্টার জন্য স্টিফেন হকিংয়ের মাথা পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু আমি সব সময়ের জন্য আইনস্টাইনের মাথাটাই বেছে নেব।’ আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় তিনটি সংগ্রহের বস্তু হলো: আইনস্টাইনের অটোগ্রাফ, বাবার দেওয়া একটা ছুরি আর পাথরের তৈরি ছোট একটা মূর্তি। আরেকটি বস্তু আমার খুব প্রিয়, আমার দাদার ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা দিয়ে দাদা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে ছবি তুলতেন। অভিনেতা না হলে মনে হয় আমি কোয়ান্টাম মেকানিকস নিয়েই পড়াশোনা করে পেট চালাতাম। আর কখনো ছবি বানানোর সুযোগ পেলে আমি আইজ্যাক আসিমভের দ্য ফাউন্ডেশনকে ভিত্তি করে সিনেমা বানাতাম। আমি ডিসকভারি চ্যানেলে আসক্ত। কুমিরদের কাজকর্ম আমাকে ভীষণ টানে। আমার কোনো সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে আমি তা কখনই পড়ি না। আমি ভয়ে পড়ি না। যদি নিজের সম্পর্কে খুব বাজে কিছু বলি থাকি! আমার নিজেকেই সবচেয়ে বড় ভয়। মানুষ হিসেবে আমরা নিজের ক্ষতি নিজেই সবচেয়ে বেশি করি। তাই পড়ি না। কখনো কোনো কিছু চুরি করার সুযোগ পেলে আমি পৃথিবীর সব পারমাণবিক বোমার নকশা চুরি করে নষ্ট করে ফেলতাম। সারা পৃথিবীতে যত সংঘাতের খবর পাই, সবই আমাকে কাঁদায়। আমি নিরুপায়, পৃথিবীর জন্য আমার কি কিছুই করার নেই? আমি সামান্য একজন কমেডিয়ান। আমার হাত-পা বাঁধা। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি স্টিফেন হকিংকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে সহায়তা করতাম। কিশোর বয়সে আমার ইচ্ছে করত লেওনার্দো দা ভিঞ্চির এজেন্ট হতে। আমি তাঁকে বকতে পারতাম, ‘লেওনার্দো, তুমি এখন কী করছ? অযথা সময় নষ্ট কেন করছ! তোমার কত কাজ বাকি!’ কিন্তু একটা সময় আমার কেন জানি মনে হতো, আমি যদি পেলে হতাম! তিনি বড়মাপের ফুটবলার। কখনো অবসর মিললে আমি বেটোফেনের পঞ্চম সুর কম্পোজ করার চেষ্টা করতাম। আমার জীবনটা মনে হয় দুই চাকার বাইসাইকেল। সাইকেলের মতো আমিও দুই পায়ে চলি, সোজা চলার চেষ্টা করি। আরেকটা জিনিস আমি খুব পছন্দ করি, তা হলো জাদু। হা করে আমি জাদু দেখি। আমার মনে হয়, মানুষই সবচেয়ে বড় জাদুকর। সবাই জাদুকর। সে সব পারে। যা ভাবে তা-ই করে, যা কল্পনা করে, তা-ই বাস্তবে আনতে পারে। আমিও একসময় জাদুকর ছিলাম। আমার ১৬ বছর বয়সের একটা ঘটনা সব সময় মনে পড়ে। সময়টা তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। একটা রোগাক্রান্ত ওক গাছ ভেঙে আমাদের এলাকার রাস্তা আটকে দেয়। আমি সেই সময়টাতে অন্যদের সঙ্গে মিলে গাছটা রাস্তা থেকে সরিয়ে দিই। আমি কেন সেই কাজ করেছিলাম, এখনো জানি না। শুধু জানি, সামনে বিপত্তি দেখা দিলে তা দুই হাত দিয়ে সরিয়ে দেওয়া যায়। জাদুর মতোই। যদি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কথা বলার সুযোগ পেতাম, তাহলে বেশি কিছু বলতাম না। আমি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের বলতাম, নিজেকে তৈরি করার জন্য যা দরকার, তাই কর। নিজেকে আগামীর জন্য তৈরি কর। বেঁচে থাকতে আমাদের সবার ছোটখাটো একটা রাইফেল লাগে, আর সেটা হলো জ্ঞান। যত পারো শেখো, শেখার কোনো শেষ নেই। সবকিছু জানার চেষ্টা করো। পচা মাংস থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়। সময়টা এখন হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের। নিজেকে তৈরি করতে হবে নিজেকেই। আর সেই সঙ্গে চুপ থাকতে শেখো। নিস্তব্ধতার মূল্য অমূল্য। আর সব সময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। তোমাকে বাছাই করতে হবে কীভাবে তুমি মরবে। তথ্যসূত্র: রবিন উইলিয়ামস ডট নেট অবলম্বনে ভাষান্তর করেছেন জাহিদ হোসাইন খান আগে চাই নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া ৭ সেপ্টেম্বর ইউএস ওপেনের শিরোপা জিতে ১৮তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় করেন টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস। তাঁর জন্ম ১৯৮১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে তিনি নারী টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে প্রথম।অনেকেই বলে আমি সুপারস্টার, সব সময় জয়ই যেন আমার লক্ষ্য। কিন্তু আসলে আমি নিতান্তই এক সাধারণ মানুষ। মহামানবী নই। একজন খেলোয়াড়মাত্র, টেনিস খেলেই দিন কাটে আমার। অন্যদের মতো আমিও কথা বলি, হাসি, চিন্তা করি। কেউ কেউ বাড়িয়ে কিংবদন্তিতুল্য অনেক টেনিস খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমার তুলনা করেন। কিংবদন্তি? আমি জানি না, আমি শুধুই সেরেনা। টেনিস কোর্টে আসলে আমি একজন অভিনয়শিল্পীমাত্র। সেখানে রাগ, অভিমান, হাসিকান্না দেখানো বিলাসিতা। দৌড়ে দৌড়ে টেনিস বলে আঘাতের পর আঘাত করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। প্রতিযোগিতায় সেরা হয়ে পদক হাতে তুলে আমি অভিনয়-দক্ষতা দেখাই। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটাই আসলে যেকোনো কাজের সাফল্য কিংবা পরিশ্রমের মূল সূত্র। মুখে হাসি রেখে কাজ করে যান, সাফল্য দরজার বাইরে আপনার জন্য অপেক্ষা করবে। পথে নামলে অন্য মানুষের সমালোচনা আসবেই। তাই বলে থেমে থাকা বোকামি। নিজের কাছে সৎ থাকাটাই সবচেয়ে বড় শক্তি তখন। সমালোচনা আসবে আবার ফিরে যাবে, কিন্তু বিভ্রান্ত হওয়া চলবে না। সাফল্য আসবে কি না তা নিয়ে হতাশ হবেন না। নিজের পথে হেঁটে চলাই তো আনন্দের, গর্বের।আমার শৈশবটা ছিল দারুণ। বোন ভেনাসের সঙ্গে খেলতে পারাই ছিল আমার ভীষণ আনন্দের। খেলায় আমি থাকতাম রাজকন্যা আর ভেনাস ছিল জাদুকর। আমাদের বেড়ে ওঠা ছিল ক্যালিফোর্নিয়া আর ফ্লোরিডা শহরে। বাবা-মা আর বোনদের নিয়েই ছিল আমার রঙিন ছোটবেলা। সেই সব দিনের কথা ভাবলে আবার ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। টেনিসের সঙ্গে সঙ্গে তখন জিমন্যাস্টিক্স আর ব্যালেতেও আমার আগ্রহ ছিল। আমি সব সময় ভেনাসকে অনুসরণ করতাম। ভেনাস যদি গণিতবিদ হতো তাহলে আমিও সম্ভবত তা-ই হতাম। আমি পড়াশোনায়ও বোনকে অনুসরণ করতাম। আমার বাবার জন্যই আজ আমরা এখানে। একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় তার পরিবার। পরিবারের কারণেই মানুষ সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে ওঠে। আমার বাবার কথা ভাবলে আমারই হিংসা লাগে। তিনি এমনই এক বাবা, যাঁর দুই মেয়েই যখন উম্বলডনের ফাইনালে খেলে আর তিনি কাউকেই সমর্থন করতে পারেন না। এটা তাঁর জন্য যতটা হতাশার, তারচেয়ে বেশি আনন্দের ঘটনা নিশ্চয়ই। আমার বয়স যখন ১৭ তখন বাবা-মায়ের পরামর্শ ছিল ‘খুশি থাকো, নিজের মতো চলো’। এখনো সেই কথা মনে রেখেছি এবং সেভাবেই চলার চেষ্টা করি। নিজের মতো চলা আর নিজেকে খুশি রাখাই মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে জয় করার নামই জীবন! সফল হবেন কি না তার উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ কিন্তু তার আগে মাঠে নামতেই হবে। চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নিজেকেই। কাউকে প্রতিপক্ষ ভেবে নয়, নিজের সঙ্গে নিজের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। আমি অনেক ছোটবেলা থেকে টেনিস খেলা শুরু করি। কখনোই মনে হয় না টেনিসই হবে আমার সব। ১৭ বছর বয়সে আমি যখন প্রথম কোনো প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করি, তখনই আমার ভাগ্য আর লক্ষ্য বদলে যায়। তার আগে পর্যন্ত আমার বিশ্বাস হতো না আমি পারব। কিন্তু মাঠে নামার পরেই সব বদলে গেছে। এর পরের গল্পটা সবার জানা। সেই ১৭ বছরের সেরেনা এখন টেনিস খেলতে পারে। কিশোর বয়স থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম ফ্রেঞ্চ ওপেন টেনিস প্রতিযোগিতায় আমি আর আমার বোন বিজয়ী হলে ফরাসি ভাষায় কথা বলব। তখন ফরাসি শিখেছিলাম, এখন নিয়মিত ফরাসি বলতে হয় আমাকে। লক্ষ্য ঠিক রাখলে কোনো স্বপ্নই বৃথা যায় না। আমার বাবার কথা ছিল, ‘তুমি যদি পরাজয়ের কথা ভাব, তাহলে পরাজয় আসন্ন’। এটা কিন্তু সত্যি। আপনি যা ভাববেন তা-ই আপনাকে পৃথিবী দেবে। নিজেকে সাধারণের মধ্যে অনন্য করে তুলতে চাইলে আপনার পরিশ্রমের বিকল্প নেই। ঘাম ঝরালেই আপনার নাম পৃথিবী মনে রাখবে। ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন থাকবেই। জয়ের স্বাদ আসলে মিষ্টি। কিন্তু জয়কে ধরে রাখাই টক! আমি সাফল্য পেলেও খারাপ সময়গুলোর কথা ভুলে যাই না। আমি প্রশংসার জোয়ারে গা ভাসাই না। সেরা হওয়ার জন্য মাঠে নামি আমি। কোনো প্রতিযোগিতায় সেরা হওয়া কিন্তু সহজ কোনো কাজ নয়। তার ওপর যদি প্রতিপক্ষের কেউ নিজের বোন হয়। কিন্তু তার পরেও আমি লড়তে মাঠে নামি। লড়াই করার মানসিকতা জীবনকে অনেক দূর নিয়ে যায়। জীবনের লক্ষ্য একবার ঠিক করে ফেললে তাকে অনুসরণ করতেই হবে। কিশোর বয়সে পাহাড় ডিঙানোর স্বপ্ন দেখলে বৃদ্ধ হলেও সেই স্বপ্ন দেখার শক্তি নিজের মধ্যে রাখতে হবে। আর তাতেই জীবন উপভোগ্য হয়ে ওঠে। সিএনএন–এর ২০১২ সালের ২৫ নভেম্বরের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান। Created with My Clipboard for Android: https://play.google.com/store/apps/details?id=com.wb.myclipboard

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জীবনে লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র চাবি হলো সাহস। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য সাহসী হওয়ার বিকল্প নেই৷ সাহসীরা ব্যর্থ হয় না।

চাণক্য নীতি দর্পণ সারাংশ: